যেভাবে একনায়কতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ

আহমেদ সাহাব

শুরু হয়েছিল বিডিআর বিদ্রোহের নামে সেনাবাহিনী হত্যা দিয়ে। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম ২০০১ সালে রৌমারীতে বিএসএফ এর সঙ্গে লড়াইয়ে ভারতের যে ১৫০ জন এবং পাদুয়ায় ১৫ জন নিহত হয়েছিল বিডিআরের হাতে, এইটা ছিলো তার প্রতিশোধ।

এমন মনে করার পেছনে কারণ ছিলো, ভারতের ডিফেন্স মিনিস্টার জসবন্ত সিং-এর বক্তব্য। সে ধমকিয়েছিলো “ আমরা বদলা নেব।”

ব্যস! তারপর সুযোগের অপেক্ষা।

সুযোগটা আসে মইনউদ্দিন এবং ফখরুদ্দীনের হাত ধরে।

সেনা হত্যার পেছনে ‘ প্রতিশোধ স্পৃহা ‘ ছাড়াও মইন -ফখরুলের সেইফ এক্সিট সহ আওয়ামী লীগের ক্ষমতারোহন কারণ হিশেবে ছিলো। একনায়কতন্ত্রের পথ তৈরির কারণ ছিলো কি ছিলো না তা নিশ্চিত নই। তবে ধারণা করি। যদিও তা তখন তা মনে হয়নি। তবে এখন মনে হচ্ছে।

তো – ‘উদ্দিনদের’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপি – লীগের উপর যে নির্যাতন চালায় তার পেছনে উদ্দেশ্য ছিলো মাইনাস টু ফর্মুলা। অর্থাৎ খালেদা – হাসিনাকে মাইনাস করে তাদের দলের স্বার্থান্বেষী নেতাদের দিয়ে দল ভেঙ্গে, দূর্বল বা পঙ্গু করে, ভিন্ন দল গঠন করে ড. ইউনূসকে সঙ্গে করে নতুন কোনো দল বানিয়ে বাংলাদেশে পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটানো। সহজ কথায় ক্ষমতাসীন হওয়া।

ব্যক্তিগতভাবে আমিও তা চেয়েছিলাম। এখনো চাই।

কারণ – নতুন কেউ ক্ষমতাসীন হলে দেশ লস এঞ্জেলেস হয়ে যাবে তা না। তবে পজিটিভ কিছু পরিবর্তন আসবে, তা নিঃসন্দেহে।

কেননা, নতুন সরকারের কারো কাছে দায়বদ্ধতা থাকে না।

উদাহারনস্বরুপঃ নুসরাত হত্যাকাণ্ডে সোনাগাজী আওয়ামী লীগের চুনোপুটি থেকে রাগব – বোয়ালরা জড়িত ছিলো। শাস্তি হবে চুনোপুটিদের। চুনোপুটিদেরও হতো না যদি বিষয়টি সব মহলে এতোটা গুরুত্ব না পেতো।

নুসরাতের ভাইকে চাকুরী দিয়েই কেসটা সমাধান করে ফেলতো।

রাগব – বোয়ালদের শাস্তি হবেনা যেহেতু তারা  কেন্দ্রদখল ও ভোট চুরি করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়েছে।

সুতরাং সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে তাদের প্রতি।

অথবা পরিবহন মন্ত্রী শাজাহানকেও উদাহরণস্বরূপ নেয়া যায়।

লীগের হয়ে রাস্তা দখলে তার ভূমিকা বিশাল। ফলে তার উদ্ভট মন্তব্যের কারণে পদত্যাগ করা জরুরী হলেও, তাকে তা করতে হয়নি। সরকারের জন্য অনেক করেছে সে। তার প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে সরকারের।

তাছাড়া এই নামমাত্র গণতান্ত্রিক দেশে ‘গণ’ কে দমিয়ে রাখার জন্য সন্ত্রাস পালতে হয়। যেমন পালা হয় শামীম ওসমানকে।

এজন্যই এদেশে ‘Little thieves are hanged but great ones escape’ টাইপ বিচার ব্যবস্থা চালু। এখানে চাইলেও কিছু কিছু অপরাধের বিচার করা যায় না। কিছু কিছু অপরাধীকে পার পাইয়ে দিতে হয়।

যেহেতু সরকারও তাদের থেকে সহায়তা নেয়ার অপরাধে অপরাধী।

সুতরাং এক অপরাধী আরেক অপরাধীর বিচার করতে পারেনা।

কিন্তু নতুন কেউ সরকারে আসলে সন্ত্রাসী বা অন্যায়কারীর প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে না। থাকলেও খুবই কম। যার ফলে তাদের পক্ষে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব এবং সহজ।

নিজের মতো করে কাজ করতে পারবে। ‘র’ এর মতো করে নয়।

যদিও ‘ উদ্দিনদের’ পেছনে ‘র’ এর হাত ছিলো বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে তা শেষের দিকে। যখন মাইনাস টু ফর্মুলা ব্যর্থ হয়েছে এবং বাঁচার পথ খোঁজা শুরু করেছে।
কিন্তু অতোটা কাবু করতে পারতো না, যতটা আওয়ামী লীগকে করেছে।

তাছাড়া ড. ইউনূস ও উদ্দীন গ্রুপ এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে তফাৎ আছে বিশাল।
এজন্যই চেয়েছিলাম মাইনাস টু ফর্মুলা সফল হোক।

যাক, এইটা ভিন্নালোচনা।

তো মাইনাস টু ফর্মুলা ব্যর্থ হয়ে গেছে। এখন তো মইন – ফখরুল বিপদে। সুতরাং বাঁচতে হবে। সেই বাঁচার বিনিময় হিশেবে সেনা হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে মনে করি।

তো – মাইনাস টু ব্যর্থ হওয়া, দেশে পুনরায় পরিবারতন্ত্র কায়েম হওয়া, আওয়ামী -বিএনপির বেঁচে যাওয়ার পেছনে মাত্র একজন ব্যক্তির ঘাড় ত্যাড়ামী দায়ী।

‘ ভূমিকা বা অবদান না বলে `দায়ী’ বলায় অনেকেই অভিমান করতে পারেন। তবে দেশ প্রেমিকরা না। এর কারণ হচ্ছে পরিবারতন্ত্র বিশাল এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে দেশে। এই তন্ত্র বিলুপ্ত না হলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আসবে না। আই স্ট্রংলি বিলিভ।

পরিবারতন্ত্রের তোষামোদি করে অনৈতিক, স্বার্থান্বেষী মানুষেরা ব্যক্তিগত ফায়দা লুটে এবং এ তন্ত্র বা কুল প্রথা টিকিয়ে রাখতে, তারা সব অনৈতিক কাজের বৈধতা দিয়ে যায়।

জিয়াউর রহমানের পারিবারিক লোকজন ছিলো না এই তন্ত্রে, আই গেজ।

বাকি সব শাসকের পরিবার ক্ষমতাকেন্দ্রের আবর্তে ছিলো, আছে।

বিশেষ করে আওয়ামী পরিবারের বলয় বিশাল এবং বিস্তৃত।

শুধু পরিবারের লোকজনই রয়েছে, এমন নয়।

তাদের হাত ধরে উঠে আসা পরিবারগুলোর অন্যান্য পারিবারিক সদস্যরাও প্রভাবশালী পদগুলোতে অধিষ্ঠিত।

ক্ষমতার টপ টু বটম একে আরেকের সঙ্গে কানেক্টেড!

ফলে অপরাধ করে পার পায়। ক্রমান্ব‌য়ে বাড়তে থাকে সাহস। হয়ে উঠে বেপরোয়া।

সমাজের আজকের বেপরোয়া অবস্থা এই পরিবারতন্ত্র বা ‘কুলপ্রথার’ সৃষ্টি।

তারা জানে মাথার উপর হাত আছে। সো, লেটস প্লে।

স্বজনপ্রীতির যে কালচার রাজনৈতিক মাঠে এবং প্রশাসনিক বিভাগে – তার উৎস বা কেন্দ্র এই পরিবারতন্ত্র।

এদেরকে দেখেই আমাদের ভেতর নেপটিজমের চারা গজায়।

এমপির ভাগিনা যোগ্যতা এড়িয়ে সম্পর্কের জোরে ডিসি হয়ে যায়।

ডিসির দুলাভাই তার সুপারিশে উপজেলা কর্মকর্তা হয়ে যায়।

উপজেলা কর্মকর্তার অনুরোধে মেট্রিক পাশ ভাতিজা ইউনিয়ন পরিষদের সেক্রেটারি!

এগুলোর রুট কাজই হচ্ছে এই চলমান পরিবারতন্ত্র।

কারণ এরাই উদাহরণ সৃষ্টি করে, পথ দেখায়। ফলে অপরকে বাধা দিতে পারে না।

প্রভাব পড়ে সর্বস্তরে। যোগ্যরা হয় বঞ্চিত। অযোগ্যরা পায় স্বত্ব।

এজন্যই চাই এর অবসান ঘটুক।

মঙ্গলকামী – দেশপ্রেমিক মাত্রই বিশ্বাস করবে উই নিড আ চেঞ্জ ফ্রম নেপোটিজম এবং এই সুযোগটা এসেছিল মইন – ফখরুদ্দীন শাসনামলে। দে ট্রাইড টু ব্রিং আ চেঞ্জ। বাট দে ফেইলড।

এই ফেইলিয়ার এর একমাত্র কারণ খালেদা জিয়া।

তৎকালীন ‘উদ্দীন’ সরকার প্রচন্ড চাপ তৈরী করেছিল খালেদা এবং হাসিনাকে দেশত্যাগ করতে।

হাসিনাকে পাঠিয়েও দিয়েছিল এবং ফিরতে বাধাও দিয়েছিল।

কিন্তু খালেদা জিয়ার চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং আপোষহীন মনোভাবের কাছে ব্যর্থ হয়েছে তাদের পরিকল্পনা। এমনকি তারেক জিয়া এবং কোকোকে শারীরিক নির্যাতন করেও এই মহিলাকে নড়ানো সম্ভব হয়নি!

ফলে হাসিনা ফিরে আসতে পেরেছে এবং আজ একনায়কতন্ত্র গঠনের পথে।

হাসিনার রাজনীতির শুরু এবং চিরস্থায়ীভাবে টিকে যাওয়ার পেছনে জিয়া পরিবার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দায়ী। একদম প্রথম থেকেই।

আজ দেশের হালহকিকত তো জানেন।

এজন্যই খালেদা জিয়া দায়ী বলেছিলাম লেখার শুরুতে।

দোষ দেই না। কেননা বেচারি ভদ্রমহিলা। চেয়েছেন সাম্যের রাজনীতি করতে। সেই সাম্যে – সম্প্রতিতে দেশের মানুষের স্বাধীনতা আজ নিপাতিত – অপহত।

যাক, প্রসঙ্গ এইটা ছিলো না। লেট’স কাম ব্যাক টু দ্যা পয়েন্ট –

অতঃপর, আওয়ামী লীগ ক্ষমতারোহন করে দেশ – বিদেশের (ভারত) স্বার্থরক্ষার চুক্তির বিনিময়ে। তন্মধ্যে সেনা হত্যার মতো চুক্তি ছিলো বলে মনে করি।

তিন পার্টি বিশিষ্ট চুক্তিটি এমন হতে পারে যে, সেনা হত্যা হবে। বিনিময়ে আওয়ামী লীগ পাবে ক্ষমতা। মইন -ফখরুল যাবে বেঁচে এবং সেটাই হয়েছিল।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রনব মূখার্জী তার বই “দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস” – এ লিখেছেন যে, মইন বললো ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে তাকে পদ থেকে বহিস্কার করা হবে!” প্রনব আশ্বস্ত করেছে মইনকে পদে বহাল রাখার দায়িত্ব তার। তবে শর্ত ছিলো দুই নেত্রীকে ছেড়ে দিতে হবে।

এখন প্রশ্ন – ১
প্রনব মূখার্জী কে মইনকে পদে বহাল রাখার?

না এইটা আসলে প্রশ্ন নয়। উত্তর। অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর। যারা মনে করেন দেশ হাসিনা চালায়, যারা মনে করেন হাসিনা রাজনৈতিক মাঠের শচীন টেন্ডুলকার, যারা মনে করেন হাসিনা স্মার্ট পলিটিশিয়ান – তাদের জন্য এই উত্তর।

তাহলে প্রশ্ন ১ হচ্ছে-

মইন কেন বলেছে ‘আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আসল’-?

বিএনপির কথা কেন বলেনি? বিএনপি ক্ষমতায় আসবে না সে কীভাবে জানে?

এখানেই প্রনবদের হিপোক্রেসি লুকিয়ে।

মইনের বক্তব্যেটার পূর্বে রয়েছে প্রনবদের বক্তব্য। সেই বক্তব্যের ধারাবাহিকতা হচ্ছে ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে।’

যেমন –
‘আমিও ভালো আছি’ – শুধু এমন বাক্য স্পষ্ট থাকলে, বুঝে নিতে হবে এর আগের অস্পষ্ট বাক্যটি ছিলো, ‘আমি ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন’- এই প্রশ্নের উত্তর। নতুবা আমি এর সঙ্গে ‘ও’ যোগ করে শব্দটি আমিও হতো না।

অর্থাৎ ভারত চেয়েছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে (আনবে) এবং সেই লাইন থেকে মইন আওয়ামী লীগের কথা বলেছে, বিএনপির নয়। মানে এইটা বিষয় ক্লিয়ার যে, এ দেশে ক্ষমতায় কে বসবে এবং তা কীভাবে চলবে তা ভারত ডিসাইড করে।

প্রশ্ন – ২

যদি শুধু ছেড়ে দেয়টাই শর্ত হয়, তবে হাসিনাকে শুধু ছাড়েনি, বিদেশেও পাঠিয়ে দিয়েছিল। মইন – ফখরুল চাওয়াই ছিলো দুজনকে ছেড়ে দেয়ার। তবে আউট অব কান্ট্রি।

অর্থাৎ প্রনব মূখার্জী যে শর্তের উল্লেখ করেছে, তা তো মইন -ফখরুল আগেই পালন করে ফেলেছে বা এমনিতেই করতো। সুতরাং এখানে সেই শর্তটা না আসার পসিবিলিটি বেশি – না?

 চলবে…

Comments

comments