মোবাইল ফোনে প্রেমালাপ; ইসলাম কি বলে?

অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান

রাসুলের যুগে মহিলারা পুরুষদের সামনেই রাসুল সা.এর কাছে নানা বিষয়ে প্রশ্ন ‎করতেন। রাসুল সা. তার জবাব দিতেন। তারা হাট বাজারে ক্রেতার সাথে ‎‎বেচাকেনা সংক্রান্ত কথাও বলতেন। পরপুরুষ ও পরনারীর সাথে কথা বলা হারাম ‎হলে রাসুল সা. অবশ্যই নারী পুরুষকে পরস্পরে সাথে কথা বলতে নিষেধ ‎করতেন।‎

অতএব কোনো বেগানা মেয়ের সাথে কথা বলা এমিতে নিষেধ নয়। সে কথা ‎সরাসরি হোক বা টেলিফোন মোবাইল ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার ইমু ইত্যাদির মাধ্যমে ‎‎যেভাবেই হোকনা কেন। তবে ইসলাম এ ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম নীতি ও সীমা রেখা ‎শর্ত শরায়েত নির্ধারণ করে দিয়েছেন।‎

কারণ আল্লাহ তাআলা নবীপত্নিগণ উদ্দেশ্য করে সকল মুসলিম নারীদেরকে ‎বলেছেন,‎
‏﴿ يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ لَسۡتُنَّ كَأَحَدٖ مِّنَ ٱلنِّسَآءِ إِنِ ٱتَّقَيۡتُنَّۚ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِٱلۡقَوۡلِ فَيَطۡمَعَ ٱلَّذِي ‏فِي قَلۡبِهِۦ مَرَضٞ وَقُلۡنَ قَوۡلٗا مَّعۡرُوفٗا ٣٢ ﴾ [الاحزاب: ٣٢] ‏
‎হে নবীপত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া ‎অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে ‎যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে। ‎‎[সূরা আল আহযাব:৩২] ‎

আল্লামা ইবনে কাসীর এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, ‘আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ ‎তাআলা নবীপত্নিগণকে কিছু শিষ্টাচার আবলম্বন করার জন্য আদেশ করেছেন। ‎এ ক্ষেত্রে উম্মতের নারীগণ তাদের অনুগামী। আল্লাহ নবীপত্নিগণকে উদ্দেশ্য ‎করে বলেন, যদি তারা তাকওয়া অবলম্বন করে থাকেন -যেমন আল্লাহ তা ‎অবলম্বন করাপর জন্য আদেশ করেছেন-তাহলে তারা সন্মান ও মর্যাদায় সাধারণ ‎নারীদের মতো হবেন না; বরং তারা সাধারণ নারীদের চেয়ে অনেক বেশি ‎মর্যাদাবান হবেন। তারপর বলেছেন, ‘(পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা ‎বলো না’। সুদ্দি প্রমুখ বলেন, এর মানে হলো পরপুরুষের সাথে কথা বললে ‎‎কোমল কন্ঠে কথা বলবে না। কারণ ‘যদি কোমল কন্ঠ কথা বলে তবে যাদের ‎অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা প্রলুব্ধ হতে পারে’। সুতরাং তাদেরকে পরপুরুষের ‎সাথে ‘ন্যায়সংগত কথা বলতে হবে’। ইবন যাইদ বলেন ন্যায়সঙ্গত ভালো কথা ‎বলবে। অর্থাৎ নারী পরপুরুষের সাথে নিজের স্বামীর সাথে যেমন কোমল কণ্ঠে ‎কথা বলেন সে রকম সুরে কথা বলবে না।‎ ‎ বরং এমন ভাবে কথা বলবে যেভাবে ‎কথা বললে কোনো পুরুষ তাদের দিকে আকৃষ্ট হবে না।‎

‎সৈয়দ তানতাবী এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, ‘এমন নম্র ও কোমল কণ্ঠে কথা ‎বলবে না যেভাবে কথা বললে পরপুরুষের মনে তোমাদের প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ ‎সৃষ্টি হবে; তাদের যৌনা আকাঙ্খা যাগ্রত হবে। তখন যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে ‎তারা তোমাদের সাথে মন্দ কথা বলার জন্য আগ্রহী হবে। নারীর চারিত্রিক ‎‎সৌন্দর্যের অন্যাতম সুন্দর্য হলো তার কণ্ঠকে এসব থেকে মুক্ত রেখে তাদের স্বামী ‎ছাড়া পরপুরুষের সাথে কথা বলা।‎

এভাবে আল্লাহ তাআলা উম্মেহাতুল মুমেনীনকে -আথচ তারা হলেন পবিত্র ও ‎‎স্বচ্চরিত্রবান নারী- পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে কথা বলার ব্যাপারে সতর্ক ‎করেছেন। যাতে এটি সকল যুগের ও সকল স্থানের নারীদের জন্য একটি ‎শিক্ষণীয় ব্যাপর হয়। কারণ নারীদের তাদের স্বামীদের ছাড়া পরপুরুষের সাথে ‎‎কোমল ও নম্র কণ্ঠে যৌনাভুতি যাগ্রত হবার মতো করে কথা বলা; বড় ধরণের ‎ফিতনায় ফেলতে পারে। ফলে যাদের হৃদয়ে ব্যাধি আছে তারা সেই নারীর প্রতি ‎আকৃষ্ট হতে পারে, প্রেমে পড়তে পারে।’ ‎

আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন,‎
‏﴿وَإِذَا سَأَلۡتُمُوهُنَّ مَتَٰعٗا فَسۡ‍َٔلُوهُنَّ مِن وَرَآءِ حِجَابٖۚ ذَٰلِكُمۡ أَطۡهَرُ لِقُلُوبِكُمۡ ‏وَقُلُوبِهِنَّۚ﴾ [الاحزاب: ٥٣] ‏
আর যখন নবীপত্নিদের কাছে তোমরা কোন সামগ্রী চাইবে তখন পর্দার আড়াল ‎‎থেকে চাইবে; এটি তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র।[সূরা ‎আল আহযাব:৫৩] ‎

এ আয়াতে নবীপত্নিগণের কথা বলা হলেও সকল মুসলিম নরনারী এর মাধ্যে ‎শামিল। সুতরাং পরনারীর কাছ থেকে কিছু চাইতে হলে পর্দার আড়ালে থেকে ‎চাওয়া বাঞ্চনীয়।‎

আবূ হোরায়রা (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। ‎তিনি বলেছেন, ‎
\كُتِبَ عَلَى ابْنِ آدَمَ نَصِيبُهُ مِنَ الزِّنَا، مُدْرِكٌ ذَلِكَ لَا مَحَالَةَ، فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا ‏النَّظَرُ، وَالْأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الِاسْتِمَاعُ، وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ، وَالْيَدُ زِنَاهَا ‏الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ ‏وَيُكَذِّبُهُগ্ধ‏
“আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানের উপর তার যেনার অংশ লিপিবদ্ধ করে ‎‎রেখেছেন। সে এ যেনার অংশ অবশ্যই পাবে। অতএব, দুই চোখের যেনা হলো ‎‎দেখা, দুই কানের যেনা হলো শুনা, মুখের যেনা হলো বলা, হাতের যেনা হলো ‎‎স্পর্শ করা, পায়ের যেনা হলো পা ফেলা, আর মনের যেনা হলো কামনা-বাসনা ‎করা। আর যৌনাঙ্গ তা সত্য প্রমাণ করে বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।’ ‎(মুসলিম: ‎‎২৬৫৭)‎

এ হাদীস থেকে প্রমাণ হয় কানের ও যেনা আছে। কানের যেনা হচ্ছে এমন সব ‎কথা শুনা যা শুনলে মানুষের মাঝে যৌনানুভ’তি জাগ্রত হয়। সুতরাং কোনো ‎পরনারীর সাথে প্রেমালপ করা নিঃসন্দেহে এই যেনার আওতায় পড়ে। অতএব ‎পরনারীর সাথে প্রেমালাপ করা হারাম।‎

‎মোট কথা পরনারীর সাথে নিম্নের শর্ত শরিয়ত মতো কথা বলা যাবে:

‎১. কথা অবশ্যই কোনো একস্থানে একাকি একত্রিত হয়ে বলা যাবে না।‎
‎২. বেগানা মেয়ের সাথে আলাপ চারিতা অবশ্যই বৈধ বিষয়ের ভিতরে হতে ‎হবে।‎
‎৩. কথা এরকম হতে হবে যাতে কারো মনে আনন্দবোধ না হয়: যদি ‎আনন্দবোধ হয় যৌনাগ্রহ সৃষ্টি করে তবে কথা বলা হারাম হবে।‎
‎৪. নারীর পক্ষ হতে কথার বলার পদ্ধতি কোমল ও নম্র হওয়া যাবে না।‎
‎৫. কথা পর্দার অন্তরাল বা নারী পূর্ণ হিজাব পরা অবস্থায় হতে হবে।‎
‎৬. প্রয়োজন অনুযায়ী কথা বলা যাবে; সুতরাং প্রয়োজনের বেশি কথা বলা যাবে ‎না।‎

এসব শর্ত পাওয়া গেলে আর ফিৎনার ভয় না থাকলে বেগানা মেয়েদের সাথে ‎কথা বলা যাবে। যেহেতু প্রেমালাফে এসকল শর্ত লঙ্গিত হয় তাই তা হারাম। ‎

ইসলাম ওয়েবের এক ফতওয়ায় বলা হয়, ‘ইসলাম যেকোনো মুসলমানের জন্য ‎‎বেগানা নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক রাখা হারাম করেছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ ‎বলেছেন, ‎‏ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ {النساء: ২৫}‏‘গোপন প্রেমিক রাখে সেরূপ না ‎হয়’।[সুরা আন নিসা:২৫] একথা মেয়েদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। আর পুরুষদের ‎প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‎وَلَا مُتَّخِذِي أَخْدَانٍ {المائدة: ৫}‏‎ ‘গোপন প্রেমিকা রাখে সেরূপ ‎‎যেন না হয়’। [সূরা আল মায়েদা:৫] কারণ এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, প্রেম ‎ফিতনা ফসাদের সবচেয়ে বড় কারণ। তাছাড়া কোনো বেগানা মেয়ের সাথে চিঠি ‎পত্র মোবাইল ইত্যাদির মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করা বৈধ নয়। আর প্রেমালাপ ‎করাও বৈধ নয়। তা আরো বেশি নিষিদ্ধ হয় যদি তা পর স্ত্রীর সাথে রক্ষা করা ‎হয়।’

Comments

comments