ঢাবি ক্যাম্পাসের আলোচিত ৬ চরিত্র

  • ছাত্রলীগ বিভিন্ন কৌশলে ভোট কারচুপি করেছে- নুর
  • পুনর্নির্বাচনের কোনোরকম সুযোগ নেই-ভিসি
  • প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবীতে আমরণ অনশন পাঁচ শিক্ষার্থীর
  • মধ্যরাতে বোরকা পরা ছাত্রীদের হেনস্তা করেছেন রাব্বানী
  • আমাদের আন্দোলন চলবে-অরণি
  • পুনর্নির্বাচনের দাবিতে ক্লাস পরিক্ষা বর্জনের ঘোষণা লিটন নন্দীর

ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন ক্যাম্পাসসহ গোটা দেশে আলোচিত ছয়জন। এরা হলেন উপাচার্য, রোকেয়া হলের প্রভোস্ট, নবনির্বাচিত ভিপি ও জিএস, পরাজিত দুই ভিপি প্রার্থী। নির্বাচনী প্রচার থেকে ভোটের দিন, এমনকি ফল ঘোষণার পর পুনর্নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলনেও নানা আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে রয়েছেন তারা।

কেন্দ্রে নুর:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র এবং নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রথম আলোচনায় আসেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটি বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর পুরোটা আন্দোলনে মাঠে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই নেতা। সে সময় নানাভাবে নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন তিনি। এরপর ঢাবি কর্র্তৃপক্ষ ডাকসু নির্বাচনের আয়োজনের উদ্যোগ নিলে আবারও আলোচনায় আসেন নুর। প্রার্থী হন সহসভাপতি (ভিপি) পদে। প্রার্থী হওয়ার পর তাকে ঘিরে নতুন আলোচনা জন্ম নেয়। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, হলগুলোতে সহাবস্থানসহ নির্বাচনী নানা দাবিতে মনোযোগ কাড়েন তিনি। গণমাধ্যমেও আলোচিত হতে থাকেন। শুরু থেকেই ধারণা করা হয়, নুর ভিপি হতে পারেন।

নির্বাচনের দিন নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার নুরই ছিলেন ডাকুসর মূল আকর্ষণ। সকাল থেকে ভোট বর্জন পর্যন্ত তাকে কেন্দ্র করেই ঘটতে থাকে নানা ঘটনা। রোকেয়া হলে ভোট কারচুপি ধরতে গেলে তাকে মারধরের অভিযোগ করেন নুর। হাসপাতালেও যেতে হয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দ্বারা কয়েক দফা হামলার শিকার হন। এরপর ‘প্রহসনের নির্বাচন’ অভিযোগ করে ভোট শেষ হওয়ার আগেই ডাকসুর ইতিহাসে নতুন ঘটনার জন্ম দেন নুর। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা নেমে আসে।

ভোটের দিন মধ্যরাতে পাল্টে যায় চিত্রপট। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ ভিপি হিসেবে নুরকে বিজয়ী ঘোষণা করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে উপস্থিত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন।

ভোটের পরদিন থেকে গোটা দেশের আলোচনার মধ্যমণি হন নুর। বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা প্রশংসাসহ তাকে নিয়ে নানা ধরনের তথ্য প্রকাশ হতে থাকে। পাশাপাশি নুুরকে ঘিরে এক ধরনের দোলাচলে থাকতে দেখা যায় সবাইকে। ভোট বর্জন আন্দোলন, নাকি দায়িত্ব গ্রহণ; শুরু হয় নুরকে ঘিরে নতুন আলোচনা। বিশেষ করে ভিপি পদ মেনে নিয়ে শপথ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ একই সঙ্গে পুনর্নির্বাচন দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশÑ নুরের এমন ধোঁয়াশা আচরণ ডাকসু আলোচনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।

গতকালও নুর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ছাত্রলীগ বিভিন্ন কৌশলে ভোট কারচুপি করেছে। বিভিন্ন পদে ছাত্রলীগ জয়ী হলেও ভিপি পদে কারচুপি করেও আমাকে হারাতে পারেনি। ভোট সুষ্ঠু হলে ছাত্রলীগ একটি পদও পেত না এবং আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ভিপি প্রার্থীর সঙ্গে আমার ভোটের ব্যবধান থাকত কয়েক হাজার।’ তারপরও নুর শেষ পর্যন্ত কী করে সেদিকে তাকিয়ে সবাই।

বিতর্কে ভিসি:

২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করে সর্বত্র বাহবা পাওয়ার কেন্দ্রে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। তবে নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার পরপরই সমালোচনার মুখে পড়তে থাকেন এই উপাচার্য। অন্যান্য সংগঠন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ আনে। এমনকি হলগুলোতে সহাবস্থান করতে পারছে না বলেও জানায়। কিন্তু একটি অভিযোগেরও সুরাহা করেননি তিনি। এ নিয়ে সাংবাদিকরা বারবার তার কাছে জানতে চাইলে তিনি ‘হল প্রভোস্ট’ ও ‘চিফ রিটার্নিং অফিসার’ দেখবেন বলে জানান। শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। ফলে নির্বাচনের আগে থেকেই ভিসির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের পক্ষে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে।

বিশেষ করে নির্বাচনের দিন ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়েন ভিসি। সমালোচনার জন্ম দেন নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া নিয়ে। ভোট দেওয়ার পর ভোটারদের হাতে চিহ্ন না দেওয়া, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স না রাখা, আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে রাখা ও সেই ব্যালট উদ্ধারের ঘটনায় ডাকসুর আয়োজনের সমস্তঅর্জন ভেস্তে যায় ভিসির। সব প্রার্থী ও শিক্ষার্থীর কাছে বিতর্কিত হয়ে পড়েন। বারবার ভোটের প্রক্রিয়ায় কোনোরকম কারচুপির সুযোগ না রাখতে শিক্ষার্থীরা দাবি করলেও তিনি তার কোনো সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়েননি। নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ শুরু হলে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট কারচুপিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ আসতে থাকলেও উপাচার্য দাবি করেন নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়েছে। বিশেষ করে তার এক বক্তব্য ঘিরে বেশ হাস্যরসের উদ্রেক হয়। একই বক্তব্য পাঁচ মিনিট বলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভিডিওসহ বক্তব্য ট্রল হতে থাকে। এই বক্তব্যের পর উপাচার্য তোপের মুখে পড়েন। একই সঙ্গে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করে কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা।

ভোটে ব্যাপক কারচুপি দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও ভোট নিয়ে ভিসির সন্তোষ প্রকাশ গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে। ডাকসু নির্বাচনের ইতিহাসে এবারই প্রথম এমন কলঙ্কজনক ঘটনার সঙ্গে নাম লেখা হলো এই ভিসির।

সোমবার মধ্যরাতে ফল ঘোষণার পর থেকেই ছাত্রলীগ ছাড়া সব প্যানেল ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে পুনর্নির্বাচনের দাবি করে। ক্যাম্পাসে নানা কর্মসূচি চলছে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত ভিসি এসব দাবি সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের সততা দিয়ে নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচন বাতিল করে তাদের প্রতি অসম্মান প্রদান করা হবে। ফলে পুনর্নির্বাচনের কোনোরকম সুযোগ নেই।’

তোপের মুখে জিনাত:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম রোকেয়া হলের প্রভোস্ট। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে যখন উত্তাল ক্যাম্পাস, তখনো আলোচনায় ছিলেন না তিনি। প্রথম আলোচনায় আসেন ভোটের দিন। রোকেয়া হলে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ ওঠে। সেই অনিয়মের সঙ্গে আলোচনায় চলে আসেন প্রভোস্ট জিনাত হুদা। সেদিন বেলা ১১টায় ভোটকেন্দ্রের পাশে একটি তালাবদ্ধ কক্ষে রাখা ব্যালট বাক্স উদ্ধার করতে গেলে শিক্ষার্থীদের বাধা দেন তিনি। এ সময় ভিপি প্রার্থী নুরুল হকসহ কোটা আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয় তার। একপর্যায়ে তিনি ভিসির দোহাই দিয়ে বলেন রুম খোলা যাবে না। পরবর্তীতে রুমের ভেতর থেকে তিনটি টিনের বাক্স পাওয়া যায়। বাক্সগুলোর তালা ভেঙে ভেতর থেকে ব্যালট পেপার উদ্ধার করা হয়। তখন থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে আসতে থাকেন এই শিক্ষক।

তাকে নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয় যখন নুরুল হক ও লিটন নন্দীসহ পাঁচ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে তিনি মামলা করেন। তাকে লাঞ্ছিত করা ও ভাঙচুরের অভিযোগ এনে ভোটের দিন রাতেই শাহবাগ থানায় মামলাটি দায়ের করেন জিনাত হুদা।

মামলার পর জিনাত হুদার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগে রোকেয়া হল সংসদ নির্বাচন বাতিল, প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদার পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবিতে গত বুধবার রাতে আমরণ অনশনে বসেন হলের পাঁচ শিক্ষার্থী। অনশনে থাকা শিক্ষার্থীরা হাউস টিউটর ও ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী কর্র্তৃক হেনস্তার শিকার হন। এ সময় হেনস্তার ছবি তুললে সাংবাদিকের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে একজন হাউস টিউটর সব ছবি ডিলিট করেন। পরে সাংবাদিকরা ছাত্রী হেনস্তার বিষয়ে প্রশ্ন করলে প্রভোস্ট জিনাত হুদা বলেন, ছাত্রীদের হেনস্তার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। ভোটের দিন রোকেয়া হলে পাওয়া ব্যালট বাক্স ভোটকেন্দ্রের বাইরে ছিল না বলেও এ সময় দাবি করেন তিনি।

এদিকে গতকাল দুপুরে অনশনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে জিনাত হুদার পদত্যাগ দাবি করেন ভিপি নুরুল হক। তিনি বলেন, ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির কারণে রোকেয়া হলের প্রভোস্ট এরই মধ্যে পদে থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। তাকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে।

এদিকে রোকেয়া হলে পুনরায় ভোটগ্রহণ, প্রভোস্টের পদত্যাগ, ছাত্রীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার দাবিতে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গত রাত ১০টাতেও হল গেটে অনশন চালিয়ে যাচ্ছিলেন ৪ শিক্ষার্থী। পরে শিক্ষার্থীরা এই প্রভোস্টের বাংলো ঘেরাও করেন। যদিও প্রভোস্ট জিনাত হুদা সাংবাদিকদের বলেছেন, পুনর্নির্বাচন দেওয়ার এখতিয়ার তার নেই।

নেপথ্যে রাব্বানী:

শুরু থেকেই ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনায় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ডাকসুর নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার আগ থেকেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্যানেলের প্রার্থীদের প্রতি তিনি সম্মান, শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দিয়েছেন বলে শিক্ষার্থীদের দাবি। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগের রাত থেকে তিনি সমালোচনার জন্ম দেন। তার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটি ক্যান্টিনের ভেতরে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোটা রাখা হয় বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে জানায়

ক্যান্টিনের কর্মচারীরা। এই লাঠিসোটা সেখান থেকে উদ্ধারও করা হয়। নির্বাচনের দিন সকালে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র তার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের দখলে চলে যায় বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। রোকেয়া হলে নবনির্বাচিত ভিপি নুরের ওপর তার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নারী কর্মীরা হামলা করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর ওপর তার নেতৃত্বেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ভোট কারচুপির নানা অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন রাব্বানী। বিশেষ করে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও প্রকাশ্যে দৃঢ়ভাবে নবনির্বাচিত জিএসকে বেশি করে আলোচনায় আনেন। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের সামনে, এমনকি ভোটের দিন দুপুরে রোকেয়া হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে শান্ত-স্থির থেকে বিশেষ ধৈর্যের পরিচয় দেন রাব্বানী।

ভোটের দিন মধ্যরাতে সিনেট ভবনে যখন নুরকে ভিপি হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়, উপাচার্যকে ভুয়া এবং ভিপি নির্বাচিত নুরকে ‘শিবির’ আখ্যা দিতে থাকেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা, তখন রাব্বানীকে কেন্দ্রীয় অন্য নেতাদের সঙ্গে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টায় দেখা যায়। অথচ পরের দিন নুর টিএসসিতে গণমাধ্যমের কাছে গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বে তার ওপর হামলার অভিযোগ আনেন।

নুর ভিপি হওয়ার পরদিন থেকেই বদলে যান রাব্বানী। পরদিন যখন ছাত্রলীগ শোভন নতুন ভিপিকে স্বাগত জানিয়ে নির্বাচন মেনে নেন, তখন গোলাম রাব্বানী ভিপি নুরকে তার ছোটভাই হিসেবে সম্বোধন করেন এবং নুর একসময় তার সঙ্গে রাজনীতি করত বলেও গণমাধ্যমকে জানান।

তবে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নস্যাতে রাব্বানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন রোকেয়া হলের সামনে অনশনে থাকা শিক্ষার্থীরা। তারা বলেছেন, বুধবার মধ্যরাতে রাব্বানীর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের হেনস্তা করেছেন। শিক্ষার্থীরা এমনও অভিযোগ করেছেন, প্রকাশ্যে রাব্বানীর কোনো ধরনের হুমকিধমকি না দিলেও ডাকসুকেন্দ্রিক বর্তমান আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের মূল কলকাঠি নাড়াচ্ছেন নবনির্বাচিত জিএস।

সোচ্চার অরণি:

জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থী অরণি সেমন্তি খান ডাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্যানেলে ভিপি (সহসভাপতি) প্রার্থী হন। এই নির্বাচনে আগে থেকেই কারচুপিসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন তিনি। তিনি প্রয়াত বাম শ্রমিক নেতা জসীমউদ্দিন ম-লের নাতনি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি কোনো বাম সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন তিনি। ব্যতিক্রমী প্যানেলের ঘোষণা দিয়েই প্রথম আলোচনায় আসেন অরণি। ‘স্বতন্ত্র জোট’ নামে এই প্যানেলের অধিকাংশ প্রার্থীই

বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, যেখানে অন্য প্যানেলগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে আলোচনায় থাকেন তিনি। বিভিন্ন দাবিতে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেনদরবার ও মিছিল স্লোগানে বেশ জমিয়ে রাখেন নিজের প্যানেলকে।

নির্বাচনের দিন সকালে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট কারচুপি হলে অন্যসব প্যানেলের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। পুনর্নির্বাচনের দাবি নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়, বাসভবনের সামনে সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে অবস্থান করেন। এই আন্দোলনের এখনো অন্যতম নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। নির্বাচনের পর দিন নবনির্বাচিত ভিপির সঙ্গে সব প্যানেল একটি বৈঠকে বসলে সেখানে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক শোভন টিএসসিতে গিয়ে নুরকে স্বাগত জানান। একই সঙ্গে শোভন অরণি সেমন্তি খানের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইলে তিনি শোভনকে ফিরিয়ে দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘গতকাল সকালে রোকেয়া হলে এরাই আমাদের মারার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন, আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। অথচ এখন ছবি তুলতে আসছেন। আমাদের রুচির অবস্থা এতটা খারাপ হয়নি। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ছবি তুলি না।’ ছাত্রলীগ সভাপতিকে এভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার পর তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সব মহলে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। যদিও বিভিন্ন ফেইসবুক পোস্টসহ অনলাইনে সেমন্তিকে নানা কটূক্তি করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে বলা হয়েছে, ‘শোভন ভাই, এমন পতিতার সঙ্গে ছবি তোলেন না।’ এমনকি তাকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন অরণি। কিন্তু কোনো কিছুই তাকে আন্দোলন থেকে টলাতে পারেনি। গতকালও অরণি বলেছেন, আমাদের আন্দোলন চলবে।

বিরোধী সংগঠক নন্দী:

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে ভিড়ের মধ্যে নারীদের যৌন হয়রানি করা হলে ঘটনাস্থল থেকে প্রতিবাদ করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন তিনি। নারীদের হেনস্তার হাত থেকে রক্ষা করতে ঠেলাঠেলিতে তিনি আহতও হন। পরে এ নিয়ে বেশ ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয় তাকে। সে থেকেই আলোচনায় লিটন নন্দী। ক্যাম্পাসে বেশ পরিচিত মুখ ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবার আলোচনায় আসেন লিটন। প্রগতিশীল ছাত্রজোট প্যানেল থেকে ভিপি হিসেবে ভোটে দাঁড়ান। নির্বাচনের আগে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ঢাবি কর্র্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বারবার। নির্বাচনের দিন বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট কারচুপিসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। ভোটের কারচুপির প্রতিবাদ করতে এবং অনিয়ম নিজ চোখে দেখতে কেন্দ্রে কেন্দ্রে যান। কারচুপি মেনে না নিতে পেরে তিনি ভোটের দিনই ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। এই আন্দোলনের তিনিই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। পুনর্নির্বাচনের দাবিতে ক্লাস পরিক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। দফায় দফায় বৈঠক করছেন ভোট বর্জনকারী সকল প্রার্থী ও প্যানেলের সঙ্গে। বলা হয়ে থাকে, পুনরায় ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মূল শক্তি তিনি। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।

Comments

comments