পিলখানা ট্র্যাজেডি: জুলেখাদের স্বপ্ন কি পূরণ হবে?

দীর্ঘ দশ বছর পেরিয়ে গেল আমার দেলুকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারি না, খুনিরা আমার ছেলের বউটাকেও মাফ করেনি। আমার নাতনিরা বাবা-মাকে হারিয়ে অনেক কষ্টে আছে। এমনটায় বলছিলেন পিলখানায় হারানো ছেলে লে. কর্নেল (অব.) দেলোয়ার হোসেনের ১১০ বছর বয়সী মা জুলেখা বেগম।

জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এসব মায়েরা আজও অতীত স্মৃতি আঁকড়ে ধরে ন্যায় বিচারের প্রহর গুনছেন। শুধু একটাই চাওয়া কখন এ হত্যাকাণ্ডের রায় কার্যকর হবে। প্রকৃত দোষীদের কখন শাস্তি হবে। তারা মনে করেন প্রকৃত দোষীদের প্রিয়জন হারানোর দায়ে দৃষ্টান্তমূলক রায় দেবেন আদালত।

দীর্ঘ দশ বছর পরও এখনও প্রকাশ হয়নি পিলখানা হত্যাকান্ডের পূর্ণাঙ্গ রায়। চিহিৃত করা যায়নি মূল হোতাদের। অন্যদিকে মিথ্যা অপবাদ নিয়ে অন্ধকার প্রকাষ্ঠে দিন কাটাচ্ছেন নিরাপরাধ বিডিআর সদস্যরা।

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে নৃশংসতায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজন লে. কর্নেল (অব.) দেলোয়ার হোসেন। অবসরপ্রাপ্ত এ সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন বিডিআর সপ্তাহের দাওয়াতে আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে।

বিডিআর’র নিহত ডিজি শাকিল আহমদ ছিলেন তার ব্যাচম্যাট ও অন্তরঙ্গ বন্ধু। বিডিআর বিদ্রোহের সময় শাকিল আহমদের বাসাতেই স্ত্রী রশনী ফাতেমা আক্তার লাভলীসহ ছিলেন তিনি।

সরেজমিনে লে. কর্নেল (অব.) দেলোয়ার হোসেনের বাড়ি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার নিজমেহার গ্রামের পাটোয়ারি বাড়িতে গেলে তার মা জুলেখা বেগম সাংবাদিকদের দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আজ ১০ বছর হলো আমার দেলুকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারি না, খুনিরা আমার ছেলের বউটাকেও মাফ করেনি। আমার নাতনিরা বাবা-মাকে হারিয়ে অনেক কষ্টে আছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আল্লাহর কাছে আমার মিনতি আমি যেন আমার পুত্র ও পুত্রবধূর খুনিদের বিচার দেখে মরতে পারি।

নিহত দম্পতির ২ কন্যা সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে শারমিন ফাইরুজ লেখাপড়া সমাপ্ত করে চট্টগ্রামে স্বামীর সঙ্গে রয়েছেন। ছোট মেয়ে নাজিফা ইশমাম ইংল্যান্ডে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিষ্টনে উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছেন।

নিহতের বড় মেয়ে শারমিন ফাইরুজ মুঠোফোনে জানান, হত্যাকাণ্ডের সময় আমি লন্ডন কলেজ অব একাউন্টেন্সিতে সিএ অধ্যয়নরত ছিলাম। আমার ছোট বোন নাজিফা ইশমাম ওই সময় চট্টগ্রাম প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তো। ১০ বছর আগের সেই দুর্বিষহ স্মৃতি আজও হৃদয়পটে ভেসে উঠে।

তিনি জানান, মানুষের মা কিংবা বাবা বিদায় নিলে একজন হয়তো পাশে থাকে আমরা এমনই দুর্ভাগা যে দুজনকেই একসঙ্গে হারিয়েছি। আজ সবই আছে শুধু মাথার ওপরের সবচেয়ে বড় ছায়া দুটি হারিয়ে গেছে।

এ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতে মামলা বিচারাধীন। আমার বিশ্বাস আমরা ন্যায় বিচার পাবো।

প্রসঙ্গত, শাহরাস্তি উপজেলার ঠাকুর বাজারস্থ নিজমেহার পাটোয়ারি বাড়ির মৃত আলতাফ হোসেন পাটোয়ারির কনিষ্ঠ পুত্র লে. কর্নেল (অব.) দেলোয়ার হোসেন। এলাকাবাসীর কাছে তিনি একজন কৃতি সেনা কর্মকর্তা ও স্বজ্জন ব্যক্তি হিসেবে খ্যাত ছিলেন। চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে চট্টগ্রামে থাকতেন তিনি।

Comments

comments