চকবাজার ট্র্যাজেডির সঠিক কারণ চিহ্নিত না হলে এর পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে

  • হস্তান্তর ৪৮, ১৯ লাশের বিপরীতে ৩৬ ডিএনএ নমুনা
  • ঢামেকে চিকিৎসাধীন ১১ জনের কেউ আশঙ্কামুক্ত নয়
  • আগুনের সূত্রপাত নিয়ে বিতর্ক চলছে

চকবাজার ট্র্যাজেডির বুধবার রাতটি ওই এলাকাসহ তৎসন্নিহিত এলাকার মানুষের কাছে একটি কালোরাত। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরের ঠিক কয়েক ঘন্টা আগে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আগুনে কেড়ে নেয়া জানমাল হারানো পরিবারগুলোর কাছে শহীদ দিবসের আগে জুড়ে দিল আরেক শোক দিবস। ভয়াবহ আগুনে অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণ আর বিপুল সম্পদ গিলে নেয়ার পর পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা এখন অনেকটাই ভুতুড়ে এলাকা। তিনদিন আগের আগুনের বিভীষিকা যেন পিছু ছাড়ছে না স্থানীয়দের। অগ্নিকাণ্ডের সময় স্থানীয় যারা বাসাবাড়ি ছেড়ে সরে গিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ ফিরলেও এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে অনেকের মধ্যে। মানুষ যখন আবাসিক ভবনে ক্যামিকেল রাখার বিরুদ্ধে সোচ্চার, তখন এলাকার ব্যবসায়ীরা ক্যামিক্যাল রাখার পক্ষে সাফাই গাচ্ছেন। তারা বলতে চাচ্ছেন, ক্যামিকেল দুর্ঘটনার জন্য দায়ী নয়, গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনার কারণ।

এদিকে, অগ্নিকাণ্ডে হাজী ওয়াহেদ মঞ্জিল নামের যে ভবনটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার বেইজমেন্টে বেআইনিভাবে রাখা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সরাতে কাজ শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্য দিয়ে পুরান ঢাকার সব রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা অপসারণের কাজ শুরু হল জানিয়ে মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, সিটি কর্পোরেশনের অভিযানের সময় কারো বাড়িতে অবৈধ কেমিকেলের মজুদ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।গতকাল শনিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে এসে ওয়াহেদ মঞ্জিলের রাসায়নিকের গুদাম ঘুরে দেখেন মেয়র। এরপর দুই দফায় দুটি ট্রাক বোঝাই করে ওই মালামাল সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়।

চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মুরাদ বলেন, সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে এসব রাসায়নিক দ্রব্য কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্প এলাকায় নিয়ে রাখা হবে।

অপরদিকে, চকবাজারের ঘটনায় অসংখ্য হতাহতের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি আবাসিক এলাকা থেকে ক্যামিক্যাল দ্রব্যের সব দোকান-গুদাম সরিয়ে নেয়া হোক। কিন্তু স্থানীয়দের যৌক্তিক দাবির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সাফাই গাইছেন ক্যামিক্যালের পক্ষে। তাদের দাবি, ক্যামিক্যাল থেকে সব ধরনের ব্যবহারিক পণ্য তৈরি হয়। ক্যামিক্যাল দুর্ঘটনার জন্য দায়ী না, গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনার কারণ। দেশ থেকে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করা হোক। গতকাল ডিএসসিসি মেয়র সাইদ খোকন চুড়িহাট্টা এলাকা পরিদর্শনে এলে ব্যবসায়ীরা ক্যামিক্যালের পক্ষে নানা শ্লোগান দিয়ে মিছিল করেন। এ সময় মেয়র তাদের যৌক্তিক সমাধানের আশ্বাস দেন।

আতঙ্ক কাটছে না চুড়িহাট্টাবাসীর:

চুড়িহাট্টা মোড় থেকে পূর্ব দিকে কয়েক গজ গেলে বাম দিকের গলির শেষ মাথার বাড়ির মালিক মো. মঈন উদ্দিন। তার সামনের ভবনে আগুন লাগায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়ির পেছনের গেইট দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বুধবার রাতে। তার বাড়ির অর্ধেক ভাড়াটিয়া ফিরে এলেও অন্যরা আতঙ্কে ফিরছেন না বলে জানান তিনি। “তাদের ভরসা দিচ্ছি যে কিছু আর হবে না, কিন্তু তারা ভরসা পাচ্ছে না,” বলেন ষাটোর্ধ্ব মঈন উদ্দিন।

নন্দ কুমার দত্ত লেনের পাশে হায়দার বখশ লেইনের একটি বাড়ির বাসিন্দা ৫২ বছর বয়সী মো. আনোয়ার হোসেনের চোখে এখনও আটকে আছে ভয়াল সেই রাতের বিভীষিকা। চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশেই তার বাসা। আগুন লাগার পর ভবনের আর সব বাসিন্দাদের সঙ্গে প্রাণ বাঁচাতে তিনিও সপরিবারে ছুটেছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। দৌঁড়াতে গিয়ে আহত হন তার স্ত্রী মুনিরা বেগম। সেই রাতের কথা মনে করে শিউরে ওঠেন আনোয়ার। “আমরা এখনো ঘুমাতে পারি না। ঘুমের মধ্যেও কান্নার আওয়াজ পাই। সকালে এলাকায় আইস্যা দেখি, লাশ আর লাশ! এই দৃশ্য সহ্য করা যায় না।”

নন্দ কুমার দত্ত লেইনের হায়দার ফার্মেসির মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেন প্লাস্টিক ব্যবসায়ী শরীফ হোসেন। এই সড়কে তার বসবাস ২৩ বছর ধরে। “আগুন লাগার আগে ফার্মেসিতে অন্তত নয়জন ছিল। ডাক্তার মঞ্জু ভাই, তার দুজন সহকর্মী, আর বাচ্চা কোলে আসা মহিলা…. আরও কেউ কেউ…… আগুন লাগার পরে বাঁচার জন্য শাটার নামায়া দিছিল….. ভাইরে… ভিতরে সব পুইড়া মরল। সকালে তাদের লাশ যখন বাইর করে…” বলতে বলতে কেঁদে উঠেন শরীফ। তাকে সান্তনা দিতে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেন আনোয়ার হোসেনসহ চুড়িহাট্টার আরো দুই বাসিন্দা।

আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ওয়াহেদ ম্যানশনের তৃতীয় তলার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলামকে পাওয়া যায় চুড়িহাট্টা মোড়ের এক কোণে। ফ্যালফ্যাল চোখে তিনি তাকিয়ে ছিলেন পোড়া বাসার দিকে। তিনি বলেন, “বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বের হয়ে আসতে পেরেছি। কীভাবে বের হয়ে গেছি সবাই জানি না।”

ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলাতেই একসঙ্গে ২৪টি মৃতদেহ পাওয়া যায়, সিঁড়ি ঘরের ফ্লোরে দলা পাকানো অবস্থায় ছিল পোড়া লাশগুলো। বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেও পারেনি হতভাগ্য মানুষগুলো। চকবাজারের ব্যবসায়ী নূর হোসেন মাত্র মিনিট কয়েকের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “মাত্র মিনিট কয়েক আগে আমি রানা-রাজুর দোকানে আসছিলাম। আমার এক বন্ধু কামালও আমারে চা খাওয়াতে চাইছিল। আমি বললাম, কালকে খামু। “একটু পরে জোরে জোরে আওয়াজ আর বিস্ফোরণ। চারপাশে আগুন আর আগুন। এমন ঘটনা আমি আর কখনো দেখি নাই। বিশ্বাস করেন, রাতে দুই চোখের পাতা এক করলে এখন খালি রানা-রাজু আর কামাল ভাইরে দেখি। কত ভালা ভালা মানুষগুলা কেমন কইরা চইলা গেল।”

অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তুপ থেকে মৃতদের লাশ বের করতে সহযোগিতা করেছিলেন মোহাম্মদ সুরুজ। মঞ্জুর ফার্মেসি, মদিনা ডেকোরেটর্স আর সড়ক থেকে ৩০টি লাশ তিনি নিজ হাতে উদ্ধার করেন।

গতকাল দুপুরে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন নন্দ কুমার দত্ত লেইনে। বললেন, দুর্ঘটনার বর্ণনা শোনার পর তার দুই শিশু কন্যার মনেও বড় প্রভাব পড়েছে। “আমার বড় মাইয়াডা ভয়ে আমারে সারাক্ষণ জড়ায়া থাকে। এই যে আসছি, সে তো আসতেই দিতে চাইতাছিল না। খালি কয়, আব্বা আবার যদি আগুন লাইগ্যা যায়, তুমি যাইও না।”

রাসায়নিকের গুদামগুলো যেন মৃত্যুফাঁদ:

নন্দ কুমার দত্ত লেইনের চাল ব্যবসায়ী মো. সালাউদ্দিন মনে করেন প্লাস্টিক, রাসায়নিকের মজুদের কারণে আগুন এত বেশি বিস্তৃৃত হয়। “আমরা কতবার বলছি, আবাসিক এলাকা থেকে এসব বিপজ্জনক জিনিস সরান। থানার লোকজনের সামনেই এসব ব্যবসা হইত। থানায় গিয়া অভিযোগ দিয়াও তো কোনো লাভ হয় নাই। নিমতলির ঘটনায় কারো শিক্ষা হয় নাই। এই এলাকার বাড়িওয়ালারাও বেশি টাকার লোভে গোডাউন ভাড়া দেয়, আর তাতে এসব মালামাল মজুদ করা হয়। দোষ তাদেরও কম না।”

ওয়াহেদ ম্যানশনের উল্টো দিকের ভবনের মালিকানা চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের। সেই ভবনের পেছনে ছোট ঘরে হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডারগুলো মজুদ করা হত বলে এলাকাবাসী জানায়।

নন্দ কুমার দত্ত লেইনের বাসিন্দা আশিকউদ্দিন সৈনিক বলেন, “ওই ভবনে বেআইনিভাবে মজুদ করা সিলিন্ডারগুলো একবার বের করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমরা। পারা যায়নি। বাড়ির পাশে এসব সিলিন্ডার রাখা মানেই যেন বাড়ির পাশে বোমা-বারুদের গোডাউন।”

ওয়াহেদ ম্যানশনের উল্টো দিকে আনাস হোটেল। তার পেছনের ভবনের মালিক দুই ভাই সোহেল ও ইসমাইল। এ ভবনের নিচতলায়ও রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে বলে জানান পাশের বাড়ির বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলিম উদ্দিন। “আমাদের তিনতলা ভবনে কোনো ভাড়াটিয়া নেই। কোনো গোডাউনের জন্যও ভাড়া দেয়া নেই। আমরা ও চাচাদের পুরো পরিবার সেখানে বাস করি। কিন্তু আমাদের বাড়ির সামনের ভবনটিতে নানা ধরনের ক্যামিক্যালের গোডাউন হিসেবে ভাড়া দেওয়া আছে। এসব তো আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদের কারণ।”

আলিম বলেন, “সরকারের কাছে আমাদের আকুল-আবেদন এসব ক্যামিক্যালের গোডাউন যেন আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া হয়। আমাদের জীবনের মূল্যের কথা যেন রাষ্ট্র একবার চিন্তা করে।”

চুড়িহাট্টা মোড় থেকে এক মিনিটের দূরত্বে ১৫/১ নম্বর বাড়ির মালিকদের একজন মো. সোহেল বলেন, তাদের সামনের লাভলু সাহেবের বাড়ির পুরোটাই বিভিন্ন রাসায়নিকের গুদাম হিসেবে ভাড়া দেয়া আছে। “এখন তো দেখছি এসব গোডাউন আমাদের মরণের ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

রাসায়নিকের কারণেই জানমালের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মন্তব্য করে সোহেল বলেন, “যারা আবাসিক ভবনে গোডাউন ভাড়া দিয়েছে, এর পরবির্তে বাসা-বাড়ি হিসেবে যেন ভাড়া দেওয়া হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”

১৪ নম্বরের পাঁচতলা বাড়ি ‘আশিকিন স্কয়ারের’ মালিকের ছেলে আশিকিন পারভেজ জানান, তাদের বাড়ির আশপাশের বিভিন্ন বাড়িতেই রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। “এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে নিমতলীর আগুনের পরও আবাসিক ভবন থেকে ক্যামিক্যাল গুদাম সরানো গেল না। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী যদি শক্ত অবস্থানে থাকত তাহলে এসব অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব হত।”

আছে ভিন্নমতও:

চুড়িহাট্টার বাসিন্দা মো. ইব্রাহিমের মতে, পিকআপ ভ্যানের সিলিন্ডার বিস্ফোরণেই আগুনের সূত্রপাত এবং বিস্তৃতি। “মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের কারণে বিস্ফোরণ ঘটেছে। আর অতিরিক্ত যানজটের কারণে অন্যান্য গাড়ির সিলিন্ডারগুলো একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে, যার কারণে এতগুলো মানুষের জীবন চলে গেছে।”

ইব্রাহিমের মতে, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নিলে সমস্যার সমাধান হবে না। যানবাহনের সকল মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার যাতে ব্যবহার না হয় সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, পুরান ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় নিয়মিত যানজট লেগে থাকে। চুড়িহাট্টার আগুনের ভয়াবহতার জন্য এ যানজট দায়ী বলে মনে করেন তিনি।“এই এলাকায় আমাদের পূর্বপুরুষরা বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা করে আসছেন। এখন আমরা ব্যবসা করছি। কেউ যদি বলে কোনো গোডাউন বা কেমিক্যালের কারণে আগুন লেগেছে, এটা সম্পূর্ণ ভুল হবে। এই আগুন কোনো কেমিক্যাল থেকে লাগেনি। সিলিন্ডার থেকে লেগেছে, সরকারকে গাড়ির সেসব সিলিন্ডার নিয়ে ভাবতে হবে।” একই অভিমত চকবাজারের ছাতা মসজিদ গলির বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাকের।

গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের শুরু:

অগ্নিকা-স্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। তিনি বলেছেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের একটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা গেছে গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।’ মেয়র বলেন, তিনি পুলিশের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন, গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুন লেগেছে। গতকাল শনিবার চকবাজারে ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এ কথা বলেন। মেয়র কথা বলার সময় পাশ থেকে কয়েকজন বলছিলেন, ‘আগে সিলিন্ডার বন্ধ করেন। সিলিন্ডার বন্ধ করেন।’
মেয়র আরও বলেন, এলাকায় যেসব বাড়িতে রাসায়নিকের গুদাম আছে, তা দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে। কোনো বাড়িতে রাসায়নিকের গুদাম পাওয়া গেলে সেই বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মেয়রের সঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা ছিলেন।

মেয়র ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার পর ‘সিলিন্ডার বন্ধের’ দাবিতে সেখানে আগে থেকে জড়ো হওয়া লোকজন মিছিল করেন। অন্যদিকে ফায়ার ব্রিগেড একজন কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাস্থলে পুড়ে যাওয়া দু’টি কারও দু’টি পিকআপ ভ্যানের সিএনজি সিলিন্ডার বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আলামত দেখা যায়নি। হোটেলগুলোর রান্নাঘর ও গ্যাস সিলিন্ডার রাখার জায়গা অক্ষত ছিল। ডিবিডিসির লাইনম্যান মোবারক হোসেন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অক্ষত ট্রান্সফর্মার দেখিয়ে বলেন, যেখানে আগুন লেগেছে সেই গলির মোড়ে কোনো ট্রান্সফর্মার নেই। আশেপাশে ৪টি ট্রান্সফরমার রয়েছে তার সবকটিই অক্ষত।

তবু আবাসিকে ক্যামিক্যাল রাখার পক্ষে ব্যবসায়ীরা:

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঝরে গেছে ৭৮টি তাজা প্রাণ। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশত মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি আবাসিক এলাকা থেকে ক্যামিক্যাল দ্রব্যের সব দোকান-গুদাম সরিয়ে নেয়া হোক। কিন্তু স্থানীয়দের যৌক্তিক দাবির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সাফাই গাইছেন ক্যামিক্যালের পক্ষে। তাদের দাবি, ক্যামিক্যাল থেকে সব ধরনের ব্যবহারিক পণ্য তৈরি হয়। কেমিক্যাল দুর্ঘটনার জন্য দায়ী না, গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনার কারণ। দেশ থেকে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করা হোক।
গতকাল শনিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাইদ খোকন চুড়িহাট্টা এলাকা পরিদর্শনে এলে ব্যবসায়ীরা ক্যামিক্যালের পক্ষে নানা শ্লোগান দিয়ে মিছিল করেন। এ সময় মেয়র তাদের যৌক্তিক সমাধানের আশ্বাস দেন।

চুড়িহাট্টা এলাকার জুয়েলারি ব্যবসায়ী হাজী আব্দুর রশিদ বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। ঝরে যাচ্ছে প্রাণ। আমরা চাই দেশ থেকে সব গ্যাস সিলিন্ডার বন্ধ করে দেয়া হোক।
ক্যামিক্যালের কারণে আগুন এলাকাটিতে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে এটা অস্বীকার করেন তিনি। তার মতে, ক্যামিক্যাল নয় সব কিছুর জন্য দায়ী গ্যাস সিলিন্ডার।

হাজী মুসলিম নামে অন্য ব্যবসায়ী বলেন, ক্যামিক্যাল থেকে সব কিছু তৈরি হয়। ক্যামিক্যাল থেকে কোনো দুর্ঘটনা আজও ঘটেনি। ইজতেমা ময়দান থেকে শুরু করে সব জায়গায় গ্যাস সিলিন্ডার কেড়ে নিয়েছে প্রাণ। আমরা এই গ্যাস সিলিন্ডার চাই না।

তবে ক্যামিক্যালের কারণে গত বুধবারের (২০ ফেব্রুয়ারি) ঘটনায় আগুন মুহূর্তে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, ঝরে পড়ে ৬৭টি তাজা প্রাণ-এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্যামিক্যালের জন্যই আপনি সব পোরতাছেন, সাজের জিনিস পাইতাছেন।’

তবে ব্যবসায়ীদের দাবির সঙ্গে একমত নন এলাকার বাসিন্দারা। তারা বলছেন, আবাসিক এলাকায় আর কোনো লাশ দেখতে চায় না, ক্যামিক্যালমুক্ত এলাকা চায়।

মোমেনা আহমেদ নামে অর্ধবয়সী এক নারী চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকার বাসিন্দা। তিনি বলেন, ক্যামিক্যাল নামে ভয়ানক পদার্থ আর আবাসিক এলাকায় চায় না। ক্যামিক্যাল না থাকলে ওই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এতো বেশি হতো না। আবাসিক এলাকায় ক্যামিক্যাল দোকান, গুদাম বন্ধ হওয়া উচিৎ।

সাইদুল ইসলাম নামে অন্য বাসিন্দার মতে, সিলিন্ডার সব সমস্যার কারণ হতে পারে না। গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার দেখতে হবে তার মেয়াদ আছে কিনা। আমারও গাড়ি আছে সিলিন্ডারে চলে। নিয়মিত সার্ভিসিং করতে হবে, সতর্ক হতে হবে। ব্যবসায়ীরা সতর্ক না হওয়ায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এখন তারা সিলিন্ডার নিয়ে নতুন ইস্যু তৈরি করার চেষ্টা করছে।

হস্তান্তর ৪৮, ১৯ লাশের বিপরীতে ৩৬ ডিএনএ নমুনা:

নিহত ৭৮ জনের মধ্যে ৪৮ লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি রয়েছে ১৯টি লাশ। যা ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া হস্তান্তর সম্ভব নয়। হস্তান্তরিত লাশ দু’টি হলো জাফর আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর। এছাড়া বাকি থাকা লাশগুলো (১৯টি) বেশি পুড়ে যাওয়ায় শনাক্তকরণে ৩৬ স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। গতকাল শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছে ঢাকা জেলা প্রশাসন ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এ বিষয়ে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. আতিকুর রহমান জানান, আমরা গত শুক্রবার রাত পর্যন্ত ৪৬ জনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষ করেছি। আজ (শনিবার) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দু’টি লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে সকালে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নামে এক ব্যক্তির লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে এবং অপরটি জাফর আহমেদ নামে আরেক ব্যক্তির লাশ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে শনাক্ত করে নিয়ে গেছে স্বজনরা।

এ বিষয়ে সিআইডির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন বলেন, শুক্রবার থেকে আজ (শনিবার) সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৯টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের বিপরীতে আমরা এখন পর্যন্ত দাবিদার ৩৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছি। আমরা এখন অপেক্ষা করছি মরদেহের দাবিদার আর কোনো স্বজন আসে কিনা। কেউ এলে আমরা তাদেরও ডিএনএ টেস্টের জন্য নমুনা সংগ্রহ করব। তবে আগামীকাল আমরা আর ঢামেকে থাকবো না। এরপর নমুনা দিতে হলে সিআইডির কার্যালয়ে আসতে হবে।

শার্ট-টুকরো দেখে লাশ দাবি, মিলছে না ডিএনএ টেস্ট ছাড়া:

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রাখা লাশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নেভিব্লু রঙের শার্টের একটি টুকরো দেখে স্বজনরা ধারণা করছেন লাশটি তাদের। হয়তো এটাই মো. আহসান উল্লাহর (৩২) লাশ! প্রায় ২০ মিনিট ধরে লাশটিকে কয়েকবার পর্যবেক্ষণ করেছেন নিহতের স্বজনরা। তারপর তারা নিশ্চিত যে লাশটি তাদের। কিন্তু ডিএনএ টেস্ট ছাড়া লাশ হস্তান্তর করা যাবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দিন বিকেলে ব্যবসায়িক কাজে একটি দোকানে যান আহসান। পরে ওই দোকানের সিটিভি ফুটেজের আহসানের গায়ের শার্টের রঙের সঙ্গে লাশটির হাতের কব্জি থেকে নেওয়া শার্টের টুকরোটিকে মেলান স্বজনরা।

শার্টের টুকরোটি শার্টের রঙের সঙ্গে মিলে যাওয়া স্বজনদের দাবি এটি আহসানের লাশ। এ ছাড়া তারাও আরও দাবি করে বলছেন, শার্টের টুকরো পাওয়া লাশের সঙ্গে আহসানের শারীরিক গঠন হুবহু মিল রয়েছে। তবে স্বজনদের এমন দাবিতে সাড়া দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা জেলা প্রশাসন।

তারা বলছেন, শার্টের একটি টুকরো দিয়ে এই লাশ শনাক্তকরণ সম্ভব নয়। ডিএনএ টেস্ট ছাড়া এই লাশ হস্তান্তর করা যাবে না।

গতকাল ঢামেক হাসপাতাল মগের্র সামনে সকাল থেকেই আহসান পরিবারের সদস্যদের ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে এনিয়ে চলছে বাকবিতণ্ডা। এর আগের শুক্রবার আহসানের ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ বড় ভাইয়ের লাশ শনাক্তকরণে সিআইডি’র কাছে ডিএনএ’র নমুনা দিয়ে যান।

মৃত আহসানের ব্যাগের কারখানার ম্যানেজার মো. রাশেদ বলেন, চকবাজারের আগুনের দিন বিকেলে ভাই (আহসান) রাজধানীর সাতরওজা চক্ষু মিয়ার গলিতে অবস্থিত নিজের ব্যাগের কারখানা থেকে চকবাজারের বাদশা ম্যানশনে যান মালপত্র দিতে। পরে তিনি রাতের দিকে ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে হায়দার ফার্মেসিতে যান শ্বাসকষ্টের ওষুধ কিনতে। এরপরে ওখানে আগুন লাগার পর থেকে তিনি নিখোঁজ।

আহসানের ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, ঘটনার পর থেকে ভাইকে অনেক খোঁজাখুজি করেছি। একপর্যায়ে নিরাস হয়ে গতকাল ডিএনএ টেস্টের জন্য নমুনা দিয়ে গেছি। কিন্তু আজকে মিটফোর্ডে গিয়ে শার্টের টুকরো দেখে ভাইয়ের লাশ চিনতে পারছি। পরে এই শার্টের টুকরো নিয়ে ডাক্তাদের কাছে গেলে তারা বলেন, এই লাশ চেনা যায় না, ডিএনএ টেস্ট ছাড়া লাশ দেয়া যাবে না। তিনি বলেন, পরে পুলিশ ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের লোকজনের কাছে গেলে তারা বলেন, ডাক্তারদের ফরেনসিক প্রতিবেদন ছাড়া তারা লাশ হস্তান্তর করতে পারবে না। এখন মনে হয় ডিএনএ টেস্ট ছাড়া ভাইয়ের লাশ চিনতে পেরেও নিতে পারবো না।

আহসানের ৪ বছর বয়সী মাকসুদ রহমান ও দেড় বছর বয়সী শরীফ উদ্দিন নামে দু’টি ছেলে সন্তান রয়েছে।
এ বিষয়ে সিআইডির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন বলেন, এই লাশ আমরা হস্তান্তর করতে পারবো না ফরেনসিক ও পুলিশ প্রতিবেদন ছাড়া।

মো. আহছান উল্লাহর গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নরেতনপুরে। তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে রাজধানীর সাতরওজা চক্ষু মিয়ার গলিতে অবস্থিত নিজের ব্যাগের কারখানা চালাচ্ছিলেন।

ঢামেকে চিকিৎসাধীন ১১ জনের কেউ আশঙ্কামুক্ত নয়:

পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটে যে ১১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন তারা কেউ আশঙ্কামুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। গতকাল বিকেলে বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন এই আশঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘যারা চিকিৎসাধীন তারা কেউ আশঙ্কামুক্ত নয়। তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বার্ন ইউনিটের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ৯ জনকে রাখা হয়েছে।’ অপরদিকে ঢামেক হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন দুইজন।

বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীনদের মধ্যে আনোয়ার হোসেনের শরীরের ২৮ শতাংশ, মাহামুদুল হাসানের ১৩ শতাংশ, রেজাউলের ৪৩ শতাংশ, সোহাগের ৬০ শতাংশ, জাকিরের ৩৫ শতাংশ, মোজাফফরের ৩০ শতাংশ, হেলালের ১৬ শতাংশ, সেলিমের ১৪ শতাংশ ও সালাউদ্দিনের শরীরের ২০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের সকলেরই শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ক্যাজুয়ালটি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন রবিউল (২৮) ও কাওসার (৩৫)। রবিউল ওয়ান স্টপ আইসিইউতে এবং কাওসার অর্থোপেডিক বিভাগের অধীনে ভর্তি রয়েছেন।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আলাউদ্দিন জানান, দুইজনের মধ্যে একজনের অবস্থা খারাপ। তবে আশঙ্কামুক্ত বলা যাবে না।

বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টা ৩৮ মিনিটে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার থানার চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের সামনে একটি পিকআপের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আশপাশের ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট ১১ ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে নেয়। এই ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭৮ জন। আহত কমপক্ষে অর্ধশত ব্যক্তি। যারা রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

Comments

comments