কাশ্মীরে মুসলিম নির্যাতন ও গণহত্যার নির্মম ইতিহাস – অপ্রিয় সত্য

ড. তুহিন মালিক

কাশ্মীরের ইতিহাস:

১৯২৫ সালে হরি সিং নামক এক হিন্দু কাশ্মীরের সিংহাসনে বসে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের সময়েও মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর সেই হিন্দু রাজার শাসনে ছিলো। সে সময় কাশ্মীরের প্রায় ৮০% মানুষ ছিল মুসলমান। দেশ বিভাগের সময় সেও কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। তা হতেও পারতো। কিন্তু হঠাৎই ১৯৪৭ সালের ২০ অক্টোবর কিছু পার্বত্য দস্যুদের আক্রমণের শিকার হয় দুর্ভাগা কাশ্মীরের অধিবাসীরা।

সে সময় দস্যুদের হাত থেকে বাঁচতে ও ভারতীয় সেনাদের সাহায্য লাভের আশায় ভারতের সঙ্গে যোগ দেয় হরি সিং, অথচ কাশ্মীরের প্রায় ৮০% মুসলমান পাকিস্তানের সাথেই যোগ দেওয়ার পক্ষে ছিল। হরি সিং এর সেই ভারতের সাথে হাত মিলানোর অঘটন আজো কাশ্মীরিদের গলার কাঁটা হয়ে আছে। যে কাঁটা দূর করতে ব্যর্থ ভারতের মতো বিশ্বের বৃহৎ ও উদার (!)গণতন্ত্র। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং ‘ Instrument of Accession’ এ স্বাক্ষর করে যা পরের দিন ভারতের সাধারণ রাজ্যপ্রশাসক কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল। এই স্বাক্ষরের পরই হামলাকারীদের উচ্ছেদ করার জন্য ভারতীয় সৈন্যরা কাশ্মীরে প্রবেশ করে। কিন্তু তীব্র শীত থাকায় তারা সবাইকে বিতাড়িত করতে পারে নি। এমতাবস্থায়, ভারত বিষয়টিকে জাতিসংঘের নিকট উপস্থাপন করে। জাতিসংঘ তখন পাকিস্তান ও ভারত উভয়কেই তাদের দখলকৃত ভূমি খালি করে দিয়ে গণভোটের আয়োজন করতে বলে। কিন্তু ১৯৫২ সালে ভারত এ গণভোটকে নাকচ করে দেয়, কারণ তারা জানত যে গণভোটে জনগণের রায় ভারতের বিপক্ষেই যেত।ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়ন শুরু থেকেই ছিল। সেই দ্বন্দ্ব ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধে রূপ নেয়। ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে। ১৯৬২ সালে ইন্ডিয়ার অধীনে জম্মু ও কাশ্মীরের ৬০% অঞ্চল (জম্মু, কাশ্মীর ভ্যালি ও লাদাখ) ছিল, পাকিস্তানের অধীনে ৩০% (গিলগিত-বালতিস্তান ও আজাদ কাশ্মীর) এবং চীনের অধীনে ১০% অঞ্চল (আকসাই চিন) ছিল।

জম্মু ও কাশ্মীর পরিচিতিঃ জম্মু ও কাশ্মীরকে জালিম রাষ্ট্র ভারত এখনও তার সর্ব উত্তরের প্রদেশ হিসেবে বলবৎ রেখেছে। এর অধিকাংশই হিমালয় পাহাড়ে অবস্থিত। এ প্রদেশের তিনটি অঞ্চল রয়েছে- জম্মু, কাশ্মীর ভ্যালি ও লাদাখ (ছোট তিব্বত)। কাশ্মীরের কিছু অংশ ভারত নিয়ন্ত্রিত ও কিছু অংশ পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত ছিল।

কাশ্মীরের দুর্ভাগ্যের কারণ ও ইতিহাসঃ তবে কাশ্মীরীদের বর্তমান গোলামী দশার জন্য শুধু ভারতই দায়ী নয়, আরও কিছু লোক দায়ী। তারা কারা? তারা হল কাশ্মীরের কিছু নেতাবৃন্দ। স্বাধীনতা খয়রাতের মাল নয়, এটি অতি কষ্টে অর্জনের বিষয়। এজন্য অপরিহার্য হল, যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব এবং জনগণের কোরবানি। মুসলমানদের অপূরণীয় ক্ষতি শুধু অমুসলিম শত্রুরাই করেনি। বড় বড় ক্ষতি করেছে মুসলমান নামধারী সেকুলার ও ইসলামের প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষী জাতীয়তাবাদী মুনাফিক নেতারা। আজ মুসলিম বিশ্ব যেরূপ বিভক্ত, শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন তার কারণ তো তারাই। বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের মুসলমানদের ন্যায় কাশ্মীরীদেরও স্বাধীন হওয়ার মোক্ষম সুযোগ এসেছিল। ভারতবর্ষের বুকে মুসলমানদের জন্য স্বাধীন দেশ রূপে যারা পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখতেন তারা কাশ্মীর নিয়ে যতটা ভাবতেন কাশ্মীরীদের নিজেদের নেতারাও ততটা ভাবেনি। ক্যামব্রিজের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী তার আবিষ্কৃত পাকিস্তান শব্দটির ‘ক’ অক্ষরটি নিয়েছিলেন কাশ্মীরের প্রথম অক্ষর থেকে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার একমাত্র যে ট্রেনটি নতুন স্বপ্নের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে সেটি ধরতে তারা দারুণ ভাবে ব্যর্থ হয়। এর জন্য দায়ী তাদের ইসলামের প্রতি বিদ্বেষী সেলুলার নেতারা। এ নেতাদেরই একজন হলেন শেখ আব্দুল্লাহ। কাশ্মীরের অমুসলিম ডোগরা রাজার বিরুদ্ধে তুমুল গণ আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ১৯৩১ সালে এবং সেটি জম্মুতে রাজার সৈন্যদের দ্বারা পবিত্র কুরআনের অবমাননা হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তখন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিল মুসলিম কনফারেন্স এবং তার নেতা ছিলেন শেখ আব্দুল্লাহ। তিনি ছিলেন চিন্তা-চেতনায় সেকুলার এবং ইসলামে অঙ্গিকার শূন্য। পাকিস্তানের স্বপ্ন তার ভাল লাগেনি। অথচ পাকিস্তান গড়ার কাজ চলছিল তার ঘরের পাশে। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল কংগ্রেস নেতা জওহার লাল নেহেরুর সাথে। নেহেরুও ন্যায় তিনিও মুসলিম লীগের দ্বি-জাতি তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। বিশ্বাসী ছিলেন ভারতীয় এক জাতি তত্ত্বে।ফলে মুসলিম লীগের সাথে সম্পর্ক না গড়ে তিনি সম্পর্ক গড়েন কংগ্রেসের সাথে। তার কাছে যেটি অধিক গুরুত্ব পায় সেটি কাশ্মীরের মুসলমানদের ঐক্য নয়, বরং সেটি কাশ্মীরের হিন্দু পণ্ডিতদের সাথে একত্ব হওয়া। ফলে দুই টুকরায় বিভক্ত হয় কাশ্মীরী মুসলমানেরা। ১৯৩৯ সালের ১১শে জুনে শেখ আব্দুল্লাহ মুসলিম কনফারেন্সের নাম পালটিয়ে রাখেন ন্যাশনাল কনফারেন্স। এভাবে একতার গুরুত্ব যে সময়টিতে সর্বাধিক ছিল তখন অনৈক্যই তীব্রতর হয়। মুসলিম কনফারেন্স দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। ন্যাশনাল কনফারেন্সের বিপরীতে মুসলিম কনফারেন্সের নেতৃত্ব দেন চৌধুরী গোলাম আব্বাস এবং মির ওয়াইজ ইউসুফ শাহ। মুসলিম কনফারেন্স পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার পক্ষে জোর দাবি জানায়।

নেহরুর সাথে আব্দুল্লাহ:
১৯৪৭ সালে হিন্দু রাজা হরি শিংয়ের সাথে শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মীর ভুক্তির পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন। মুসলিম স্বার্থের সাথে এরূপ বিশ্বাসঘাতকতার বিণিময়ে শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী হন। এবং কারারুদ্ধ করা হয় পাকিস্তানপন্থী নেতা চৌধুরী গোলাম আব্বাসকে। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক নিছক বিশ্বাসঘাতকই, তাদের গুরুত্ব বেশীকাল টিকে থাকে না। এমনকি যাদের কাছে নিজেদের বিক্রি করে তাদের কাছেও না। নেহেরুও সাথে শেখ আব্দুল্লাহর সম্পর্কে ফাটল ধরতে থাকে। ১৯৫৩ সালে তার মনে কাশ্মীরকে স্বাধীন দেশ রূপে দেখার স্বপ্ন জাগে। কিন্তু কুমিরের পেটে একবার ঢুকলে কি সেখান থেকে বেড়িয়ে আসা যায়? ভারত সরকার তাকে এ স্বপ্ন দেখার শাস্তি স্বরূপ ১৯৫৩ সালের ৯ই আগষ্ট কারারুদ্ধ করে। শেখ আব্দুল্লাহ যখন জেলে তখন ভারতের শাসনতন্ত্রে কাশ্মীরের যে আলাদা মর্যাদা ছিল সেটিও বিনষ্ট করা হয়। পাকিস্তান তখনও জাতিসংঘে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে মাঝে মধ্যে উত্তপ্ত আলোচনার সূত্রপাত করতো। ১৯৬৭ সালে শুরু হয় গোপন স্বাধীনতা সংগ্রাম। নেতৃত্ব দিচিছল আল ফাতাহ নামে একটি সংগঠন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের বছরে ভারত সরকার এ গোপন আন্দোলনকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ তখন ভারতের পালে প্রচণ্ড বাতাস। পাকিস্তানকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেওয়ার সুযোগ ভারত তখন খুব ভাল ভাবেই কাজে লাগায়। আর তার কিছুটা ইফেক্ট কাশ্মীরেও পড়ে। অবশেষে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধি সরকার শেখ আব্দুল্লাহর সাথে চুক্তি করে। এবং আবার তাকে কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী করে। শেখ আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর একই চেতনার অনুসারী পুত্র ডাঃ ফারুক আব্দুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী হন। তবে এখন এ পরিবারটি রাজনীতির মৃত ঘোড়া।

রক্তাক্ত কাশ্মীর ও দখলদার ইন্ডিয়াঃ ভারতের অহংকার, এ বিশ্বে তারাই সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু একথা বলে না, তারাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণ-বাদী ও দখলদার দেশ। তার নমুনা কাশ্মীর। দুনিয়ার আর কোথাও মাথাপিছু হারে এত অধিক সংখ্যক দখলদার সৈন্য নেই যা রয়েছে কাশ্মীরে। ইরাকের জনসংখ্যা ২ কোটি ৭৫ লাখ (জুলাই, ২০০৭য়ের একটি হিসাব মোতাবেক) এবং আয়তন ১৬৯,২৩৫ বর্গমাইল। ইরাকে দখলদার মার্কিন ও তার মিত্রবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। আফগানিস্তানের জনসংখ্যা তিন কোটি বিশ লাখ (জুলাই, ২০০৭য়ের হিসাব মোতাবেক) এবং আয়তন ২৫১, ৮৮৯ বর্গমাইল। এবং সেখানে দখলদার ন্যাটো বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা এক লাখের মত (২০০৭ এর একটি হিসাব অনুযায়ী এবং এটা আরও বেশি হওয়ার কথা!)। কাশ্মীরের জনসংখ্যা মাত্র এক কোটি এবং আয়তন ৮৫, ৮৬৬ বর্গমাইল। অধিকৃত সে কাশ্মীরে ভারতীয় দখলদার বাহিনীর সেনা সংখ্যা ৫ লাখ। অর্থাৎ প্রতি একলাখ মানুষের জন্য ইরাকে যেখানে ৫৪৫ জন এবং আফগানিস্তানে যেখানে ৩১২ জন দখলদার সেনা, কাশ্মীরে সে সংখ্যা হল ৫ হাজার!!! হিসাবে দাঁড়ায়, গড়ে প্রতি ১০০০ কাশ্মীরীর জন্য রয়েছে ২০জন ভারতীয় সৈন্য। প্রতিটি কাশ্মীরী পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি গড়ে ৫ জন ধরা হয় তবে অর্থ দাঁড়ায়, যে গ্রামে ২০০ ঘর মানুষের বাস সেখানে অবস্থান নিয়েছে ২০ জন ভারতীয় সৈন্য। প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশ পাকিস্তানে সর্বমোট সৈন্য সংখ্যা হল ৬ লাখ ১৯ হাজার। তাহলে বুঝুন শুধু কাশ্মীরেই যদি ৫ লক্ষ সৈন্য থাকে তাহলে কি পরিমাণ সৈন্য ভারত সেখানে মোতায়েন করেছে!

কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর বিশাল অবস্থান আজ থেকে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই। তবে সে সংখ্যা ব্যাপক ভাবে বেড়েছে ১৯৮৯ সালে। কারণ তখন থেকেই কাশ্মীরে ভারতপন্থি শেখ আব্দুল্লাহ পরিবারের প্রভাব ব্যাপক ভাবে লোপ পায় এবং তীব্রতর হয় স্বাধীনতার দাবী। সে দাবী এখন প্রতিদিন তীব্রতর হচ্ছে এবং সে সাথে দিন দিন বাড়ছে সৈন্য সংখ্যা। সম্ভবত: সেদিন বেশী দূরে নয় যখন এ সৈন্য সংখ্যা ১০ লাখে গিয়ে পৌঁছবে। অথচ ভারত বিশ্বজুড়ে বলে বেড়ায়, ভারত উদারপন্থী, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক দেশ ব্লা ব্লা ব্লা!! গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিগণ তো সে দেশের নাগরিকত্ব স্বেচ্ছায় বরণ করে নিবে, আইন মেনে চলবে। কিন্তু তাদের মাথার উপর এত সৈন্য কেন? কোন গণতান্ত্রিক দেশে এর নজির আছে কি? সমগ্র ভারত শাসনেও এতজন ইংরেজ সৈন্য ছিল না যা এখন ভারতীয় সৈন্যের লেবাসে রয়েছে কাশ্মীরে। এটিই কি গণতন্ত্রের নমুনা? ভারত একথাও বলে বেড়ায়, কাশ্মীরী জনগণ ভারতের সাথে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছে এবং তারা ভারতীয় নাগরিক রূপেই থাকতে চায়।
প্রশ্ন হল, কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর এ বিশাল উপস্থিতি কি সেটাই প্রমাণ করে? কোন জেল খানায় ১ হাজার কয়েদীর বাস হলে সে জেলখানার পাহারায় কি এভাবে মিশিন গান ও কামানধারি ২০ জন সৈন্য পাঠানো হয়? পাঠানো হয় কি ট্যাংক, হেলিকপ্টার গানশিপ ও সাঁজোয়া গাড়ি। কোন দেশে কি তার নিজদেশের জনগণের ঘরের সামনে মেশিন-গানধারি সৈন্য পাঠায়? ঘর ও রাস্তা পাহারার জন্য কি কামান, সাঁজোয়া গাড়ি বা ট্যাংক পাঠায়? এগুলো তো থাকবে সীমান্তে। স্বাধীন দেশের জনগণ তো নিজঘর ও রাস্তাতো নিজেরাই পাহারা দেয়। রণ প্রস্তুতি নিয়ে ঘরে সামনে যখন সৈন্যের আগমন ঘটে তখন বুঝতে কি বাঁকি থাকে, সে সৈন্যের আগমন ঘটেছে স্বাধীনতার হরণে, প্রতিরক্ষায় নয়। কোন দেশে সৈন্য কি ঘরে ঢুকে স্বাধীনতার প্রতিরক্ষা দেয়? তারা তো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বা ঘরের সামনে খাড়া হয় কোন দেশকে জেলখানা করতে। যেমনটি ইসরাইলী সেনাবাহিনী করেছে সমগ্র ফিলিস্তিনে। তবে কাশ্মীরকে এখন জেলখানা বললেও ভুল হবে। জেলখানার কয়েদী থেকে তার কাঙ্ক্ষিত দেশের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয় না। কিন্তু ভারত সেটি কাশ্মীরীদের থেকে কেড়ে নিয়েছে। কাশ্মীরী জনগণ বহু আগেই প্রমাণ করেছে, তারা ভারতের নাগরিক হতে চায় না। এটি তাদের উপর জোর করে চাপানো হয়ে। ১৯৪৭ সালে হিন্দুরাজা জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ মুসলিম নাগরিকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভারতে যোগ দিয়েছে। তারা চায় পাকিস্তানে যোগ দিতে।

কাশ্মীরবাসীরা কি আদৌ ইন্ডিয়ার সাথে থাকতে চায়?
জাতিসংঘ তত্ত্বাবধানে নির্বাচন করে ভারতই প্রমাণ করুক কাশ্মীরীরা কোন দিকে যোগ দিতে চায়, ভারতে না পাকিস্তানে। ভারত বলে, সেখানে বহু নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু কথা হল, সে নির্বাচনগুলো হয়েছে কে মন্ত্রী বা এমপি হবে সে প্রশ্নে। কাশ্মীর কোন দিকে যোগ দিবে সে মৌলিক বিষয়ে নয়। এমন নির্বাচন তো ব্রিটিশের উপনিবেশিক শাসনামলে ভারতেও হয়েছে। তাদের রচিত সংবিধানই বলে এই ভোট জনগণের অধিকার। গণতন্ত্র নিয়ে বড়াই করলেও ভারত সে অধিকার কাশ্মীরীদের দিতে রাজী নয়। জেলখানায় বসে বার বার ভোট দিলেই কি গণতন্ত্রচর্চা হয়? কাশ্মীরীদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ নয় যে ভোটে কে মন্ত্রী হবে বা এমপি হবে। তাদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ হল তারা কোন দেশের সাথে থাকবে। ভারতের সাথে থাকতে কোনভাবেই রাজি নয়। আর সেটি নির্ধারিত হলেই পরের প্রশ্নটি আসে সে দেশে কারা মন্ত্রী বা এমপি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ ভারত তাদেরকে সে অধিকার দিতে রাজী নয়। কাশ্মীর আজ অশান্ত এবং দেশটিতে দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে অবিরাম রক্ত ঝরছে মূলত এ ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই। ভারতের এ গণতন্ত্রকে তার আর গণতন্ত্র বলতেও রাজী নয়। তাদের কাছে এটি ডেমোক্রেসি নয়, বরং ডিমোনক্রেজী। ইংরাজি শব্দ ডিমোনের অর্থ ভূত, আর ক্রেজ হলো খ্যাপামী। কোটি কোটি দেব-দেবতার ও ভূত-পেতের দেশে এখন কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভূতুড়ে খ্যাপামিই চেপেছে। এমন খ্যাপামির কারণে অসম্ভব হয়ে পড়েছে গণতন্ত্র-সম্মত সমাধানের। এবং গুরুত্ব হারিয়েছে শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলন। কাশ্মীরীদের স্বাধীনতা আন্দোলন কতটা তীব্র আকার ধারণ করেছে সেটা বুঝানোর জন্য প্রখ্যাত ভারতীয় সাহিত্যিক অরুণদ্ধুতি রায় লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ানে কয়েক বছর আগে যে নিবদ্ধ লিখেছেন সেটি তথ্যবহুল। তিনি লিখেছেন, গত ১৫ই আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। সেদিন শ্রীনগরের কেন্দ্রস্থল লালা চক দখলে নিয়েছিল বিশাল জনসমুদ্র। তারা আওয়াজ তুলছিল ‘জিয়ে জিয়ে পাকিস্তান’। অর্থাৎ পাকিস্তান জিন্দাবাদ। স্লোগান তুলছিল, ‘হাম কেয়া চাহতে হেঁ?’ (আমরা কি চাই?)জনতার মুখে জবাব ছিল ‘আজাদি’ (স্বাধীনতা)। জিজ্ঞাসার সুরে স্লোগান উঠছিল, ‘‘আজাদি কা মতলব কেয়া (অর্থ: স্বাধীনতার লক্ষ্য কি?) জনতা সমস্বরে জবার দিচ্ছিল- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আওয়াজ উঠছিল, পাকিস্তান ছে রিশতা কিয়া? (অর্থ: পাকিস্তানের সাথে আমাদের সম্পর্ক কি?) জনতা জবাব দিচ্ছিল, ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’। তারা বলেছে, ‘‘এ্যায় জাবেরো, এ্যায় জালেমো! কাশ্মীর হামারা ছোড় দো’’ অর্থ: ‘‘হে অত্যাচারী, হে জালেম! আমাদের কাশ্মীর ছেড়ে দাও।’’ অরুন্ধতী রায় আরো লিখেছেন, তারা আরো বলেছে, ‘‘ভুখানাঙ্গা হিন্দুস্তান, জানছে পেয়ারা পাকিস্তান।’’১৫ই আগস্টে সবুজ পতাকা ছেয়ে ফেলেছিল শ্রীনগর শহর। অথচ ভারতের স্বাধীনতার এ দিনটিতে ভারতের পতাকা শোভা পাওয়াই স্বাভাবিক ছিল। ঐ দিনকে ‘গোলামীর দিন’ রূপে ধ্বনিত করছিল। জনতার ঢল নেমেছিল শুধু শ্রীনগরে নয়, শহরতলীর গ্রামগুলোতেও।

দেখুন: http://www.theguardian.com/world/2008/aug/22/kashmir.india

বাস, টেম্পো, ট্রাক, মটর সাইকেল ও রিকশায় চেপে মানুষের ঢল নেমেছিল শ্রীনগরের রাজ পথে। ভারতপন্থি দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিপলস’ ডিমোক্রাটিক পার্টির নেতাদের দিল্লিস্থ টিভি স্টুডিওতে দেখা গেলেও তাদের কারো সাহস ছিল না শ্রীনগরের রাজপথে নামার। undefined মনে হচ্ছিল, জনগণ যেন নতুন ভাবে নিজেদের আবিষ্কার করেছে। লোপ পেয়েছে ভয়, জেগে উঠেছে তাদের প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস। অরুন্ধতী রায়ের কথায় মনে হয়, ফিলিস্তিনীদের ইন্তেফাদা (গণঅভ্যুত্থান) যেন নেমে এসেছে শ্রীনগরের অলি-গলিতে। ফিলিস্তিনী শিশু ও যুবকেরা যেমন নির্ভয়ে পাথর ছুড়ে ইসরাইলী আর্মির টহলদার গাড়ির উপর, তেমন চিত্র শ্রীনগরেও। শহর জুড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির শোভা পাচ্ছে সবুজ পতাকা। শ্রীনগর শহরের যেন নতুন সাজ। ভারতীয় গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুললে মহিলারা তারস্বরে বলে, কিসের স্বাধীনতা? ভারতীয় সৈন্যদের হাতে ধর্ষিতা হওয়ার স্বাধীনতা? তবে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ও অহিংস পথে শুরু হলেও ভারতী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সেটিকে শান্তিপূর্ণ থাকতে দেয়নি। ইতিমধ্যে বহু নিরীহ নাগরিককে তারা হত্যা করেছে। প্রায় প্রতিদিনই চলছে গুলিবর্ষণের ঘটনা। ভারতীয় সেনারা শ্রীনগর শহরে কারফিউ জারি করছে, কিন্তু কারফিউ ভেঙ্গে মিছিল হচ্ছে। এবং প্রাণও দিচ্ছে। এ প্রাণদান গণ্য হচ্ছে পবিত্র শাহাদাৎ রূপে।

বর্তমান অবস্থা, দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হয়েছে নতুন ফিলিস্তিনঃ কাশ্মীরে ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন যেন দিন দিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। স্বাধীনতার দাবিতে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে বিচ্ছিন্নতাবাদী ট্যাগ লাগিয়ে গুলি করে খুন করা হচ্ছে। undefined শুধু পুরুষরাইনয়, রেহাই পাচ্ছেনা নারী, শিশু, বৃদ্ধ কেওই। এ ঘটনাগুলার বেশিরভাগই ঘটছে জম্মু এবং কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে। যখনই ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী কাউকে হত্যা করছে বিচার না পাওয়ায় তখনই অন্যরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে এবং নিরস্ত্র শিশুরা গুলির জবাবে নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছুঁড়ছে। ট্যাঙ্ক সহ সামরিক বহর ওয়ালা ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর সশস্ত্র বাহিনীর দিকে কিছু শিশুর পাথর চোরা এততাই বিপজ্জনক যে সে কারণেই এ কে ৪৭ দিয়ে নির্বিচারে ব্রাশ ফায়ার করে সৈন্যরা তার জবাব দিচ্ছে। একইসাথে কাশ্মীরের রাজ্যশাসক ও ইন্ডিয়ান ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর এ গুলিবর্ষণকে আত্মরক্ষার কথা বলে ন্যায্যতা দিয়ে যাচ্ছে। নিরস্ত্র কিছু শিশু একটা সুসজ্জিত বাহিনীর জন্য হুমকি- বিশ্বকে এখন এটাও মেনে নিতে হবে।

অপহরণ, হত্যা ও ধর্ষণঃ অপহরণ, হত্যা ও ধর্ষণ: কাশ্মীরি নারীদের গুম করে নিয়ে ধর্ষণ করে ইন্ডিয়ার সেনারা। আবার খোলামেলা সবার সামনেই গণধর্ষণ করছে তারা। এটাসেখানে এখন খুবই সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইনডিপেন্ডেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনালের দেয়া তথ্য অনুযায়ী উনিশশ একানব্বই সালের বাইশে ফেব্রুয়ারি ইন্ডিয়ার সেনাবাহিনীর একটা দল কুনান পুশপরা গ্রামে এসে প্রথমে নারী ও পুরুষদের আলাদাভাবে আটক করে। এরপর চৌদ্দ থেকে একশ বছর বয়সের অন্তত তেইশ জন নারীকে তাদের স্বামী, সন্তান বা বাবার সামনে গণধর্ষণ করে। গত ২০১০ সালের পয়লা এপ্রিল জম্মু কাশ্মীরের পুলিশ জানিয়েছে, নভেম্বর দুই হাজার দুই থেকে জুলাই দুই হাজার আট সাল পর্যন্ত–ছয় বছরে ইন্ডিয়ার সেনাদের বিরুদ্ধে একান্ন জন নারী ধর্ষণের অভিযোগ এসেছে। কাশ্মীরের রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার কমিশন–স্টেট হিউমেন রাইটস কমিশন (এসএইচআরসি) ২০০৮-২০০৯ বছরে কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ৪০৪ টা মামলা করেছে। যার মধ্যে ৬ টা ধর্ষণ, ৪৩ টা নিখোঁজ এবং ৯ টা পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা অন্যতম।

২০১০ সালের জুন মাসে জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতীয় দখলদার বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে ১০২ জনের মৃত্যু হয়ে। এদের কেউ তথাকথিত সশস্ত্র জঙ্গি নন এবং মৃতদের মধ্যে শিশু ও কিশোরও আছে। ভারতীয় জঙ্গি বাহিনীর এ নির্দয় নির্বিচার গণহত্যার প্রতিবাদে কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে উচ্চকিত স্লোগান দিয়েছে।
বিস্তারিত দেখুন http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=39625

‘ডেইলি গ্রেটার কাশ্মীর’ ২৯ জুন,২০১০ প্রতিবেদন ছাপে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত কাশ্মীরে নিহতের মধ্যে বারো জন ছিল তেরো থেকে উনিশ বছর বয়সের। তাদের মধ্যে নয় জনকেই আধা সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) সদস্যরা গুলি করে হত্যা করে। পত্রিকার পাতায় যে প্রতিবেদনগুলা ছাপা হয়েছে সেগুলা আসল ঘটনার খুবই সামান্য চিত্র। কারণ কাশ্মীরে ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলা অপরাধ করে সে অপরাধ প্রকাশের আলামত ও উপায়ও বন্ধ করে দেয়। একইভাবে মানবাধিকার কর্মী বা সাংবাদিকদের ওপর সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশে তারা তাদের সুবিধা মত বহু বিধি নিষেধ আরোপ করে রেখেছে। ফলে সেখানে ইন্ডিয়ান সেনাদের ভয়ে অত্যাচারিত হয়েও অনেক নিরীহ মানুষ মুখ খুলতে পারে না। যে কারণে গুমহত্যা সহ অসংখ্য হত্যা, ধর্ষণ এবং অপহরণের খবর অজানাই থেকে যায়।

গণকবরঃ

২০১১ সালের আগস্টে কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলের তিনটি এলাকায় ৩৮টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যাই। জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর স্টেট হিউম্যান রাইটস কমিশন (সিএইচআরসি) গত তিন বছর ধরে চেষ্টা চালানোর পর এসব গণকবর খুঁজে পাওয়া পায়। সিএইচআরসি জানিয়েছে, এসব গণকবরে ২ হাজার ১৫৬টি লাশ পাওয়া গেছে। ধারনা করা হয় ৯০ এর গণ আন্দোলনের গণহত্যার লাশ এগুলি।
শ্রীনগরভিত্তিক সংগঠনটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী উনিশশ উননব্বই সাল থেকে এ পর্যন্ত কাশ্মীরে আট হাজার লোক গুম হয়েছে। ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ধরে নিয়ে ফেরত দেয় নাই। এবং এরপর তাদের আর কোন খোঁজও পাওয়া যায় নাই। সংগঠনটি তথ্য প্রমাণ দিয়ে দেখাচ্ছে, উত্তর কাশ্মীরের বান্ডিপুরা, ব্যারামুল্লা ও কুপওয়ারা জেলার পঞ্চান্নটা গ্রামে দুই হাজার সাতশটা অজ্ঞাত ও অশনাক্ত গণকবর আছে। এগুলা শনাক্ত করে লাশ উদ্ধারে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত পরিষদ গঠনে শ্রীনগর সরকার ও দিল্লি সরকারের কাছে আহবান জানিয়েছে আইপিটিকে

সরাসরি খুনঃ
গাজা উপত্যকায় সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম নির্যাতন ব্যাপক আকারে শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালের ২০ জানুয়ারি এক ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। ওই ঘটনার প্রতিবাদ করতে মিছিল করে নিরস্ত্র মুক্তিকামী কাশ্মীরি জনগণ। কিন্তু ইন্ডিয়ার সেনা সহ রাজ্য সরকারে নিরাপত্তা বাহিনী মিছিলটিতে নির্বিচারে বেপরোয়া গুলি বর্ষণ করে কমসে কম একশ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। গোয়াকাডাল ব্রিজে সংঘটিত সেই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের বীভৎস স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় কাশ্মীরের জনগণকে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা এখন পর্যন্ত চলছে। ওই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এসব অবিচার এবং খুনের ঘটনার জন্য এ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক নেতা কিংবা সেনা কর্মকর্তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হয় নাই। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিটা খুনই জনমনে ক্ষোভ তৈরি করেছে। যেখানে একদিকে ইন্ডিয়ান সেনাদের জুলুম, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ আরেক দিকে কাশ্মীর রাজ্য সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর দমন পীড়ন, রাজ্যের বেআইনি হত্যাকান্ড ও অন্যায় নিপীড়ন সমান তালে চলছে কাশ্মীরে। মোটকথা এসব ঘটনা কাশ্মীরিদের বিক্ষোভ, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরো শক্তিশালী করে তুলছে।

হত্যার উদ্দেশ্যে মাথা ও বুক বরাবর গুলি বর্ষণঃ ইন্ডিয়ার সরকার বলছে, তারা মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য পায়ের নিচে গুলি করছে। কিন্তু হাসপাতালের রেকর্ড বুকগুলায় পায়ের নিচে গুলির আলামতের কোন কথাই নাই।undefinedকারণ বেশিরভাগ গুলি ও টিয়ারগ্যসের সেল ছোঁড়া হয় মাথা ও বুক বরাবর। কাশ্মীরের শীর্ষস্থানীয় ট্রমা সেন্টার এসএমএইচএস হসপিটালে বিশ দিনের একটা অনুসন্ধান করা হয়। তাতে দেখা যায়, নানা বিক্ষোভ ও আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ চৌদ্দ জনের মধ্যে ছয় জনের বুকেই গুলি পাওয়া যায়। একজনের গলায়, একজনের বাম কাঁধে এবং একজনের বাহুতে গুলি করা হয়েছে। হাসপাতালের অপারেশন কক্ষের রেকর্ডবুকে গুলি লাগা বা গুরুতর আহত রোগীদের যে তথ্য সংরক্ষণ করা হয় সেখান থেকেই এ তথ্যগুলা পাওয়া গেছে। তিন সপ্তাহে তারা মাত্র একজনকে পেয়েছে, যে গুলিতে না টিয়ার সেলের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছে। এবং এটাও ছিল মাথায় আঘাত। হাসপাতালের দুর্ঘটনা বিভাগের একজন সিনিয়র ডাক্তার কাশ্মীর টাইমসকে জানান, শরীরের নিচের অংশে গুলিবিদ্ধ হয়েছে এমন একটা ঘটনাও তারা গত তিন মাসে পান নাই। গুলি লেগে, টিয়ার সেলে বা বন্দুকের বাঁটের আঘাতে আহত–সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে দেহের ওপরের অংশেই আঘাতের দাগ। তিনি বলেন, এই কয়দিনে আমরা গুলি লাগা কাউকেই পাই নাই, যাকে দেখে মনে হয়েছে লক্ষ্যবস্তু ছিল দেহের নিচের অংশে। এমনকি আমরা অনেকের সম্পর্কে কোন তথ্যই নিতে পারি নাই। কারণ সেসব আহত রোগীদের ভয় ছিল এখানে তথ্য প্রকাশ করলে যে কোন সময় গ্রেফতার হতে পারে তারা। যেহেতু হাসপাতালের সব তথ্যই সিআইডি সদস্যরা প্রতিদিন নিয়ে যায়। এসব কারণে হাসপাতালে আসা সব আঘাত প্রাপ্তদের সংখ্যা জানা যায় না।

বিশ বছরে লাখো মানুষ হত্যাঃ কাশ্মীরে এ পর্যন্ত ঠিক কতজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, কত নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে, কি পরিমাণ বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে এবং কত সংখ্যক মানুষকে নিরাপত্তা বাহিনী ধরে নিয়ে ফেরত দেয় নাই তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। This image has been resized. Click this bar to view the full image. The original image is sized 720×504.undefined নানা পক্ষ থেকে নানা পরিসংখ্যান দাবি করা হয়েছে। কাশ্মীরের স্বাধীনতার প্রচারণা সংগঠন কাশ্মীর আমেরিকান কাউন্সিলও (কেএসি) একটা পরিসংখ্যান করেছে। তাতে তারা দাবি করেছে, স্বাধীনতা আন্দোলনের গত বিশ বছরে নারী, শিশু ও যুবক মিলিয়ে এক লাখ নিরীহ কাশ্মীরি ইন্ডিয়ান সেনা এবং রাজ্যের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে খুন হয়। স্থানীয় এনজিও আইপিটিকের দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৮৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কাশ্মীর উপত্যকায় ইন্ডিয়ান সৈন্যদের হাতে নিহতের সংখ্যা সত্তর হাজারেরও বেশি।

হত্যাসহ সমস্ত অপরাধ কর্মকাণ্ড চালানো বৈধঃ ইন্ডিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীরে খুন, অপহরণ, লুটপাট, নির্যাতন, ধর্ষণ, নিজস্ব হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা এবং অগ্নিসংযোগ সহ সব অপরাধ কর্মকাণ্ড-ই বৈধভাবে করতে পারছে। এসব কর্মকাণ্ড- অপরাধ হলেও এগুলা তাদের জন্য বৈধ।undefinedকারণ এর পেছনে আছে আর্মড ফোর্সেস অ্যাক্ট বা বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৫৮ (এএফএসপিএ)। আইনটার মাধ্যমে এ অঞ্চলে নিয়োজিত বাহিনীর সব ধরনের অন্যায় ও অপরাধ কর্মকাণ্ড – বৈধ বলে ঘোষণা দিয়েছে ইন্ডিয়া। আইনটা জারি করা হয় ১৯৯০ সালের জুলাই থেকে। এতে আসলে কাশ্মীরিদের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে কোন অভিযোগ আনারই আইনগত অধিকার রাখে নাই ইন্ডিয়া সরকার। ফলে আইনটি ব্যবহার করে এখন ইন্ডিয়ান সেনারা নির্বিচারে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। মোটকথা এর ফলে জনগণের তরফে ন্যায্য অভিযোগ তোলারই কোন আইনি অধিকার নাই।

ইন্ডিয়ান সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে ইজরাইলি সেনা কর্মকর্তারাঃ কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীদের দমনে ইন্ডিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি রণকৌশলগত বন্ধু ইজরাইলের সহযোগিতা নিচ্ছে। ইজরাইলি সেনাকর্মকর্তারা কাশ্মীরে এসে ইন্ডিয়ান সেনাদের হাতে কলমে শিক্ষা দিচ্ছে কিভাবে নির্যাতন চালিয়ে বিদ্রোহ দমন করতে হয়। এবং সংখ্যাগুরু একটা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নির্যাতন করে কিভাবে সংখ্যালঘুতে পরিণত করতে হয়। এ সংখ্যালঘু করাটা তাদের নিছক একটা কৌশল; যার আসল মানে হল, সেখানকার স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।

দেখুন: http://www.informationclearinghouse.info/article1164.htm ইন্ডিয়ায় তার প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইটে বলেছে, ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে ইজরাইলি সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল আভি মিজরাহি অনির্ধারিত সফরে কাশ্মীরে এসে ইন্ডিয়ান সেনা ঘাঁটি পরিদর্শন করেন। এছাড়া তিন দিন ইন্ডিয়ায় অবস্থান করে মিজরাহি ঊর্ধ্বতন ইন্ডিয়ান সেনা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি ইজরাইলি সেনাবাহিনীর দ্বারা ইন্ডিয়ার সন্ত্রাস বিরোধী কমান্ডোদের প্রশিক্ষণের খসড়া নিয়ে আলোচনা করেন। প্রশিক্ষণের ব্যাপারগুলাতে গোপনীয়তা বজায় রাখা এর অন্যতম নীতি। এ সফলে ইজরাইল ইন্ডিয়াকে পরামর্শ দিয়েছে, ‘আমরা ফিলিস্তিনিদের সাথে যা করছি তোমরাও কাশ্মীরিদের সাথে তাই কর। ২০০২ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ইজরাইলের কাছ থেকে ইন্ডিয়া পাঁচ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কেনে। ইন্ডিয়ার সাথে ইজরাইলের সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধি করা যায় কার্গিল যুদ্ধের সময়। ওই যুদ্ধে ইন্ডিয়াকে জয়ী করতে অস্ত্র এবং সামরিক প্রশিক্ষণে এগিয়ে আসে ইজরাইল।

হিন্দুদের বিশেষ আকর্ষণ কাশ্মীরি মুসলিম নিধনঃ কাশ্মীরীদের মাঝে ক্ষোভের যে আগুণ ভিতরে ভিতরে বহুদিন ধরে জ্বলছিল সেটিতো বিস্ফোরিত হওয়ারই ছিল। বিস্ফোরণের জন্য পেট্রোল যেন বিছানোই ছিল। সরকার তাতে বারুদ ঢেলে দিয়েছে। আর সে বারুদটি হল, কাশ্মীর সরকারের পক্ষ থেকে ১০০ একর সরকারি জমি অমরনাথ মন্দির কমিটির হাতে হস্তান্তর। অমরনাথ মন্দিরের বিষয়টিও হঠাৎ করে সামনে আসেনি। এসেছে পরিকল্পিত ভাবে। ১৯৮৯ সাল অবধি অমরনাথ মন্দিরে বছরে প্রায় ২০,০০০ তীর্থযাত্রী আসতো। কিন্তু ১৯৯০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএস এ মন্দিরকে ঘিরে এমন প্রোপাগান্ডা শুরু করে যে হিন্দুদের মধ্যে এক নতুন ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি হয়। ফলে বাড়তে থাকে অমরনাথ মন্দিরে তীর্থযাত্রীদের সংখ্যা। ২০০৮ সালে এসে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ লাখে। মাস খানেক আগে প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে যখন মন্দিরের জন্য সরকারি জমি দেওয়ার ঘোষণা হয় তখনই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে। কাশ্মীরী মুসলমানদের বক্তব্য, ইসরাইলীরা যেমন ধর্মীয় ইস্যুর ভিত্তিতে ফিলিস্তিনে ইহুদীদের আবাদি বাড়িয়ে চলেছে, উগ্র হিন্দুরাও তেমনি কাশ্মীরের কেন্দ্রভূমিতে হিন্দু আবাদি বাড়াতে চায়। এভাবে তারা কাশ্মীরের জনসংখ্যায় মুসলমানদের অনুপাতটি কমাতে চায়। তাদের কথা, মন্দিরের নামে ১০০ একর জমিদারকে তারা সে প্রকল্পেরই অংশ। মুসলিমদেরকে যেনতেন প্রকারে নির্মূল করতে এই হিন্দুরা সদা প্রস্তুত!

স্থানীয় গণমাধ্যমের ওপর নির্বিচার বলপ্রয়োগঃ কাশ্মীরের গণমাধ্যমগুলাকে হত্যা করা- নিয়ে কথা বলতে দিচ্ছে না ইন্ডিয়া। সংবাদ পত্র এবং টিভি চ্যানেলগুলার ওপর কড়া সেন্সরশিপ আরোপ করেছে তারা। আদেশ অমান্য করলে পত্রিকা বন্ধ করে দিচ্ছে। আবার কোন কোন টিভি চ্যানেল বা পত্রিকার বিরুদ্ধে মামালা ঠুকে সংবাদ প্রচারের কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিক্ষোভের সংবাদ ছাপানোর অপরাধে এ পর্যন্ত কাশ্মীরের দুইটা টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে ইন্ডিয়া। যাদের বেশি বিপজ্জনক মনে করছে সে সব সংবাদিকাদের গুম করে ফেলছে তারা।
কড়া বিধি নিষেধ জারি করায় নিরাপত্তা বাহিনীর অনুমতি বা ইচ্ছার বাইরে কোন তথ্য সংগ্রহ বা সরবরাহ করতে পারছে না সাংবাদিক ও মানবাধিকার। কারফিউর সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পাসও দেয়া হয় না। ফলে কাশ্মীরের ভেতরে আসলে লাখ লাখ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং আর্মি কি করছে তা জানার সুযোগ বাইরের দুনিয়ার খুব কমই আছে। সরকারের দমন-নির্যাতন ও বেআইনি কর্মকর্তা বিরুদ্ধে কথা বলার মানে সেখানে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করা। এমনকি নির্যাতিতদের আইনি সহায়তাও জীবনের ঝুঁকি নিয়া করতে হয়। কারণ যারা এ সহায়তা দিচ্ছে তাদের ওপরও সরকার নির্যাতন চালাচ্ছে। জম্মু এবং কাশ্মীর বার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মেয়া গাইয়ুমকে গত মাসের সাত জুলাই মধ্যরাতে বাড়ি রেড দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যায়। তার অপরাধ, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে কথা বলেছেন। এবং অত্যাচারিতদের আইনি সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি তাকে অন্যায়ভাবে নিয়ে যাবার প্রতিবাদ করলে বার এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জি এন শাহীনকেও আটক করে।

প্রতিরোধ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই যখন বিকল্প: কাশ্মীরের জনগণের ওপর ইন্ডিয়ার দমনমূলক আচরণ তাদের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ দমন-নির্যাতন প্রক্রিয়া তারা দিনেদিনে আরো ব্যাপক করে তুলেছে। যে কারণে শিশুর কিশোর, নারীরাও এখন প্রতিবাদ প্রতিরোধে রাস্তায় নেমে আসছে। একইসাথে নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা, নির্যাতন, হামলা ও দমনও আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব ঘটনা জারি রেখেই ইন্ডিয়া নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দাবি করছে। আর কাশ্মীরিরা যুগের পর যুগ তাদের হত্যা, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। এখন তাদের সামনে প্রতিরোধ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কায়েমের জন্য সর্বোচ্চ যা করার সেটা ছাড়া কোন উপায় নেই। আর সেটা হল অস্ত্র ধারণ করা।

ভারতের গোলামী থেকে মুক্তির লক্ষ্যে স্বাধীনতা আন্দোলন আবার তীব্রতা পায় ১৯৮৯ সালে এবং সেটি আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত রাশিয়ার বিতাড়নের পর। তখন বহু আফগান ও পাকিস্তানী মুজাহিদদের নজর কাশ্মীরের জ্বিহাদের উপর পরে। গড়ে উঠে বহু জিহদী সংগঠন। এরা চায় একটি ইসলামিক ভূমি। সে সাথে জম্মু-কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (জেকেএলএফ) নামে একটি সংগঠনও কাজ করছে। এ সংগঠনটি শেখ আব্দুল্লাহর ন্যাশনাল কনফারেন্সের মতই সেকুলার। এবং তাদের লক্ষ্য পাকিস্তানভূক্তি নয়। চায়, জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে একটি স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু রাজপথে স্লোগান শুনে মনে হচ্ছে, রাজনীতির হাওয়া পাল্টে গেছে। সেকুলারদের হাত থেকে হয়তো মুক্তি পেয়েছে কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলন। কারণ অধিকাংশ মানুষ চায় ইসলাম। তবে এ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কি হবে সেটি বোঝা যাবে অচিরেই ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানু তায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠা হবেই হবে, তা সেটা কাফির মুশরিকরা যতই অপছন্দ করুক না কেন, ইনশাআল্লাহ!

ফেসবুক থেকে

Comments

comments