চিরনিদ্রায় শায়িত ‘সোনালী কাবিন’-এর কবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। দুপর আড়াইটার দিকে মৌড়াইল কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

এর আগে বেলা সোয়া ১১টার দিকে কবির মরদেহ নেওয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিয়াজ মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে। সেখানে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বাদ জোহর বিদ্যালয় মাঠে তার তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে শনিবার রাত ৮টা ১০ মিনিটে আল মাহমুদের মরদেহ ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দক্ষিণ মৌড়াইল মোল্লাবাড়িতে এসে পৌঁছে।

শুক্রবার রাত ১১টার পর বার্ধক্যজনিত কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান ‘সোনালী কাবিন’ এর কবি আল মাহমুদ। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

পর দিন শনিবার দুপুরে কবির মরদেহ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নেয়া হয় শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সেখানে একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী কবির মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

এর পর কবির মরদেহ নেয়া হয় জাতীয় প্রেসক্লাবে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এরপর কবির লাশ জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বাদ জোহর কবির দ্বিতীয় জানাযা সম্পন্ন হয়।

কবি আল মাহমুদের প্রথম ও দ্বিতীয় জানাযায় সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

কবি আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনা ও বাকভঙ্গিতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। সাহিত্যের অনেকগুলো শাখায় বিচরণ করেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এ প্রধান কবি। শুধু কবি হিসেবেই নয়, তিনি একাধারে একজন শক্তিমান গাল্পিক, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামের এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আল মাহমুদ। তার পিতার নাম মীর আবদুর রব এবং মাতার নাম রওশন আরা মীর। বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাইস্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাইস্কুলের পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু।

ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বেগম আর তাদের পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়েই ছিল তার সংসার।

মাত্র ১৮ বছর বয়স ১৯৫৪ সালে সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন। তখন থেকেই তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ঢাকা আসেন এবং পত্রিকায় কাজ নেন, তখনই সাহিত্যে পুরোদমে মনযোগী হন।

বিখ্যাত ‘সোনালী কাবিন’ ছাড়াও কবি আল মাহমুদের রচনার মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর, কালের কলস, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না, বখতিয়ারের ঘোড়া, একচক্ষু হরিণ, দোয়েল ও দয়িতা, দ্বিতীয় ভাঙ্গন, নদীর ভিতরে নদী, না কোনো শূন্যতা মানি না, বিরামপুরের যাত্রী, বারুদগন্ধি মানুষের দেশ, সেলাই করা মুখ, তোমার রক্তে তোমার গন্ধ ইত্যাদি।

কবির সাড়া জাগানো উপন্যাস কাবিলের বোন, পানকৌড়ির রক্ত, উপমহাদেশ, ডাহুকি, যেভাবে বেড়ে উঠি, আগুনের মেয়ে, যমুনাবতী, চেহারার চতুরঙ্গ, যে পারো ভুলিয়ে দাও, ধীরে খাও অজগরী ইত্যাদি।

বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে বাংলাকাব্যে অনবদ্য বহুমাত্রিকতার সৃজনশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য কবি আল মাহমুদ দেশের জাতীয় পদকসহ পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, জয়বাংলা পুরস্কার, হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার, ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার, সুফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, সমান্তরাল (ভারত) ভানুসিংহ সম্মাননা পদক, লেখিকা সঙ্ঘ পুরস্কার, হরফ সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও নতুন গতি পুরস্কার ইত্যাদি।

তাঁর মৃত্যুতে সাহিত্যাঙ্গনে শোকের ছাড়া নেমে এসেছে। রাজনৈতিক দলের নেতারাও তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

Comments

comments