পিয়ারু মিয়া আসলেন, তবে চিরনিদ্রায়

বিংশ শতকের অন্যতম কবি আল মাহমুদ। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। এই মহাকবির মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্রামের বাড়িতে।

জেলা সদরের মৌড়াইল মোল্লাবাড়িতে কেটেছে কবির শৈশব ও কৈশোর কাল। মৃত্যুর খবরে তার বাড়িতে ছুটে আসেন বন্ধু ও স্বজনরা।

তারা বলছেন, শান্ত স্বভাবের কবি চলাফেরায় ছিলেন নম্র ও ভদ্র। তবে জীবদ্দশায় উপযুক্ত মূল্যায়ন না পাওয়ায় হতাশ এখানকার সংস্কৃতিজনরা, স্থানীয়রা তাকে চিনে পিয়ারু মিয়া নামে।

আগে মাঝে মাঝে তিনি এলাকায় যেতেন। তখন ভক্তদের ঢল নামতো। পৈতৃক ভিটায় গিয়ে কখনও কখনও তিনি চলে যেতেন তিতাস নদীর পাড়ে অথবা স্থানীয় শ্মশানে। সেখানে গিয়ে তিনি লেখালেখি করতেন।

সদ্যপ্রয়াত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি আল মাহমুদ সম্পর্কে এমন তথ্য দেন তার ভাতিজা মীর রব্বান হোসেন।

১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন কবি আল মাহমুদ। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। নিজ এলাকায় তিনি পিয়ারু মিয়া নামে পরিচিত ছিল।

তার ছোট ভাই মীর ফরহাদ হোসেন মারা গেছেন আরো তার আগেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কবি আল মাহমুদের পৈতৃক ভিটা আছে কিন্তু নিজের ঘর নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যখন আসতেন, উঠতেন ছোট ভাইয়ের বাসায়।

কবির আপন ভাতিজা মীর রব্বান হোসেন (রবিন) জানান, কাকা মাঝে মাঝে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এলেও নিজ পৈতৃক ভিটাতে থাকেননি। প্রায় এক যুগের বেশি সময়। আর অসুস্থতাজনিত কারণে গত এক বছর ধরে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসেননি।

তিনি বলেন, কাকার পৈতৃক ভিটায় আগের দিনের একটি চৌচালা ঘর বা রাউডি ঘর ছিল। যখন উনি আসতেন ওই ঘরে অবস্থান করতেন। সেখানে ঘরটি ভেঙে এখন ভবন করা হয়েছে। এতে মনে অনেক কষ্ট পেয়েছেন। এরপর থেকেই উনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসা কমিয়ে দিয়েছিলেন।

রবিন আরও বলেন, নিজ বাড়িতে যখন আসতেন তখন তার ভক্তদের ভিড় লেগে থাকত। তাদের সঙ্গে গল্প করে অনেক সময় দিতেন। দিনে বেশির ভাগ সময় বসে থাকতে বাড়ির সামনের পুকুরে ঘাটে। অনেক সময় বড়শি দিয়ে মাছও শিকার করতেন। যখন তার ইচ্ছে হয়েছে চলে যেতেন তিতাস নদীর পাড়ে, সেখানে গিয়ে তিনি লেখালেখি করতেন।

মুরব্বিদের মুখে শুনেছি, কাকা অনেক সময় একা একা চলে যেতেন শহরের শিমরাইলকান্দি শ্মশানে। সেখানে বসে লেখালেখি করতেন। কবি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভাষাসৈনিক মুহাম্মদ মুসা জানান কবিকে হারানোর ক্ষতি অপূরণীয়।

খেলাধুলা বাদ দিয়ে বই পড়াকেই ধ্যানজ্ঞান মনে করা কবির অনেক সৃষ্টির সাক্ষী তিনি। কবি আব্দুল মান্নান সরকার জানান জীবদ্দশায় কবিকে মূল্যায়ন না করতে পারায় দুঃখ প্রকাশ করেন এই কবি।

এদিকে শনিবার রাত ৮টা ১০ মিনিটে কবি আল মাহমুদের লাশ জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে আসা হয়। তবে এবার আসলেন চির ঘুমিয়ে। এ সময় তার স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষীরা ও নানা শ্রেণিপেশার মানুষ তাকে এক নজর দেখতে ভিড় জমায়।

আল মাহমুদের ঘনিষ্ঠ সহচর আবিদ আজম জানান, রোববার সকাল ১১টা থেকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার লাশ নিয়াজ মুহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ে মাঠে রাখা হবে।

সোনালী কাবিনের কবিকে স্থানীয় নিয়াজ মুহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বাদ জোহর জানাজা শেষে জেলা শহরের মোড়াইল কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন লোক লোকান্তর, কালের কলস, কাবিলের বোনের স্রষ্টা কবি আল মাহমুদ।

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন বাংলা সাহিত্যে অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে রাজধানী ইবনে সিনা হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

Comments

comments