রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ চান জাহালম সুলতান

বিনা অপরাধে তিন বছর কারাভোগের পর হাইকোর্টের নির্দেশে জাহালম নামে পাটকল শ্রমিক এক যুবক গত রোববার রাতে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার ভুল কিংবা গাফিলতির কারণেই এমনটা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগেও বিনা অপরাধে কারাভোগের কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা কতটুকু সচেতন বা দায়িত্বশীল হয়েছেন তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন থেকেই যায়।

তদন্তকারী কর্মকর্তার ভুলে মুন্সীগঞ্জের এক ব্যক্তি ১৭ বছর কারা ভোগ করার পর আদালতে প্রমাণিত হন তিনি নির্দোষ এবং খালাস পান। আর সাতক্ষীরায় এক ব্যক্তি ১৩ বছর কারাভোগ করে, কারাগারেই মারা যান। এরপর প্রমাণিত হয় তিনি নির্দোষ ছিলেন এবং খালাস পান। বিনা বিচারে কারাগারে বছরের পর বছর থাকার পর যদি প্রমাণিত হয় যে আটক ব্যক্তি নির্দোষ-তাহলে এর দায় কার। এ অপূরণীয় ক্ষতি তিনি কীভাবে পূরণ করবেন।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যান ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, সংবিধানে বলা আছে, বিনা বিচারে কাউকে আটক রাখা যাবে না। কিন্তু আমাদের দেশে যে কারাগারগুলো আছে, সেখানে দুই-তৃতীয়াংশ বন্দি বিনা বিচারে আটক রয়েছে। এমনিতে আমাদের কারাগারগুলোয় ধারণক্ষমতার তিন-চার গুণ বেশি বন্দি রয়েছে।

জানা গেছে, বিনা অপরাধে জাহালম তিন বছর কারাভোগ করেছেন দুদকের একটি মামলায়। দুদকের তদন্ত কর্তকর্তার ভুল কিংবা গাফিলতির কারণেই এমনটা হয়েছে বলে আইনজ্ঞরা মনে করছেন। ঘটনা তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি কমিটি গঠন করেছে। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গতকাল জানিয়েছেন, জাহালমের ঘটনায় দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের যদি কোনো গাফিলতি থেকে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এজন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা জজ পদমর্যাদার দুদকের একজন পরিচালককে প্রধান করে কমিটি করা হয়েছে। গত রোববার রাত ১টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুরের কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে মুক্তি পান জাহালম। সোনালী ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতির ২৬টি মামলা থেকে জাহালমকে এক দিনের মধ্যেই অব্যাহতি দিয়ে গত রোববার সকালে মুক্তির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। মূল আসামি আবু সালেকের বদলে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়। রাতে মুক্তি পাওয়ার পর বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকের জাহালম বলেন, ‘আমাকে বিনা বিচারে আটকে রেখেছে। আমি দুদকের বিচার চাই। আমি রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ চাই।’ যাদের জন্য বিনা বিচারে জেলে আটকে ছিলেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি জানান তিনি।

জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে ২০১৪ সালে আবু সালেক নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুদক। এর পর সালেককে তলব করে দুদক চিঠি দিলে সেই চিঠি পৌঁছায় জাহালমের টাঙ্গাইলের বাড়ির ঠিকানায়। নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুটমিলের শ্রমিক জাহালম তখন দুদকে গিয়ে বলেন, তিনি আবু সালেক নন, সোনালী ব্যাংকে তার কোনো অ্যাকাউন্টও নেই। ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য আবু সালেকের যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে সেটিও তার নয়। কিন্তু দুদকে উপস্থিত বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা সেদিন জাহালমকেই ‘আবু সালেক’ হিসেবে শনাক্ত করেন। পরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোড়াশাল থেকে জাহালমকে গ্রেপ্তার করে দুদক।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, দুদকের মামলায় বিনাদোষে তিন বছর কারাভোগ করেছেন জাহালম। তবে, দুদক তো রাষ্ট্রের অংশ। যেকোনো ফৌজদারি মামলায় সব সময় বাদী হয় রাষ্ট্র। তো সর্বোপরি এ মামলাটি রাষ্ট্র বনাম জাহালমের মধ্যে বিদ্যমান। এখানে রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে দুদক মামলা করেছে। সুতরাং এখানে রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের ফলে জাহালমের ক্ষতি হয়েছে এবং রাষ্ট্রের পক্ষে ভুল স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।

অতএব, এখানে প্রথমেই জাহালমের আইনজীবীদের উচিত ছিল- যে হাইকোর্ট বেঞ্চ জাহালমের জামিনের আদেশ দিয়েছেন, সেই আদালতের কাছে জাহালমের আপাতত পুনর্বাসনের জন্য অন্তত ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়া। জাহালমের আইনজীবী আদালতে ক্ষতিপূরণের আবেদন না করলে আদালত তা দেবেন না। কেননা আদালতে কাজ বিচার করা। যেখানে দুটি পক্ষ থাকবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া জাহালমের ক্ষতিপূরণ বিষয়ে বলেন, হাইকোর্টে যে রুলটা জারি হয়েছে সে রুলটিই ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত। রুলটা তো তাকে খালাস দিতে বলেছে কিন্তু রুলটা তো নিষ্পত্তি হয়নি। এখন কেউ যদি ইন্টারভেনার হয়ে দরখাস্ত দেয় বা যিনি বিষয়টি আদালতের নজরে এনেছেন তিনি যদি দরখাস্ত দেন তাহলে বিষয়টি ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে সহজ হবে। মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগে শুনানির মধ্যে দরখাস্ত করতে হবে।

জানা গেছে, এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মধ্যপাড়া করারবাগ এলাকার বাবুল বিনা অপরাধে ১৭ বছর কারাভোগের পর খালাস পান। ১৯৯৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর মীরহাজিরবাগে খুন হন মোখলেসুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। ডেমরা থানার মামলা নম্বর-১৫৩(১২)৯৮। এ মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি বাবুলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। যার বিশেষ দায়রা মামলা নম্বর-৫৫৪/১৬। এ মামলার আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আদালতের রায়ে বাবুল নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং মুক্তি পান।

নির্দোষ ওবায়দুরের কারাগারেই মৃত্যু
নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পর খালাসের আদেশ কারাগারে পৌঁছার আগেই মারা যান সাতক্ষীরার ওবায়দুর রহমান ওরফে অবেদ আলী (৬৫)। সাতক্ষীরার জোড়া পুলিশ হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ওবায়দুর রহমান পুলিশি প্রহরায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন গত বছর। তার কারামুক্তির আইনগত কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১৩ বছর জেলে থাকার পর মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

Comments

comments