ভারত না ছাড়লে রোহিঙ্গাদের হত্যার হুমকি!

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও মিলিশিয়াদের নিপীড়নের মুখে ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ভারতে আশ্রয় নেয়। বিশেষ করে ২০১২ ও ২০১৪ সালে অভিযানে রাখাইন থেকে এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্ত ও সমুদ্রপথে ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোতে ঢুকে পড়ে।

জাতিসঙ্গের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মতে, এদের মধ্যে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা শুধু শরণার্থী তালিকাভুক্ত।

আলজাজিরা জানায়, হায়দ্রাবাদে বালাপুর শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া হোসাইন অনেকের মতোই ২০১৪ সালে রাখাইন থেকে বাংলাদেশ হয়ে সীমান্ত পার হয়ে হায়দ্রাবাদে চলে আসেন।

তিনি বলেন, ‘এখানে শিবিরে বসবাসের পরিবেশ তেমন একটা খারাপ না। রাখাইনে যে পরিস্থিতি আমরা দেখে এসেছি, সে তুলনায় এখানে থাকাই আমাদের জন্য নিরাপদ।’

কিন্তু গত বছর থেকে দেশটিতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। ইতোমধ্যে এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে।

হোসাইন বলেন, ‘গত এপ্রিল থেকে শরণার্থী শিবিরে নিয়মিত ঢুকছে পুলিশ। তারা আমাদের থেকে ফরম পূরণ করিয়ে নিচ্ছে ও বায়োমেট্রিক ডাটা নিচ্ছে। ফলে শিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে যে, আমাদেরকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হবে।’

বিশেষ করে গত অক্টোবরে সাত রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের হাতে তুলে দেওয়ার পরে এ আতঙ্ক আরও বেশি বৃদ্ধি পায়। ২০১২ সালে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করায় এ সাতজন আসামের কারাগারে বন্দী ছিলেন এতদিন।

এদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এভাবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে ভারত সরকারের সমালোচনা করেছে। কারণ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জীবন ও স্বাধীনতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। দেশটির সরকার এসব রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং চরমভাবে আইন লঙ্ঘন করে যাচ্ছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘পাঠ্যপুস্তকে চিত্রিত গণহত্যার’ অভিযোগ আনে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব। সে বছর আগস্ট মাসে দেশটিতে নিপীড়ন, গণহত্যা ও গণধর্ষণ শিকার মুসলিম জাতিগোষ্ঠীটির সাড়ে সাত লাখের মতো মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের নামে ভারত আসলে দেশটিতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে তাড়াতে চাচ্ছে। অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।

হোসাইন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ভারতে ‘খারাপ’ কিছু হওয়ার আগেই পরিবারসহ বাংলাদেশে পাড়ি দেবেন। এজন্য স্ত্রী, সন্তান, মা ও ভাইদের নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছেন। গত তিন মাস ধরে যাওয়ার পথ খুঁজছেন।

এ বছরের শুরুতে অন্তত ১৩০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পাড়ি দিয়েছেন। একইভাবে পালাতে গিয়ে ৬১ জন রোহিঙ্গা ভারতের পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন।

ভারত সরকার সব রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, সেখানে আশ্রয় নেওয়া বৈধ ও অবৈধ সব রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদেরকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। দেশটির সরকারের মতে, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো তাদেরকে দলে ভেড়ানোর ঝুঁকি আছে।

৭৫ বছর বয়সী ফয়েজ আহমেদ জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভারত থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশই এখন সবচেয়ে নিরাপদ। এখানে বিভিন্ন শিবিরে অনেক আত্মীয়-স্বজনরা আছে।’

তিনি বলেন, ‘গত ছয় বছর ধরে আমি জম্মুর শিবিরে ছিলাম। গত বছর একদিন পুলিশ আমাদের শিবির পরিদর্শনে আসে এবং আমাদের সবার তথ্য নিয়ে যায়। এতে শিবিরের পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে যায়।’

তিনি জানান, ‘এমনকি স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতারাও আমাদেরকে হুমকি দিতে থাকে। ভারত ছেড়ে না গেলে আমাদেরকে হত্যা করার ভয় দেখায়।’

দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সহায়তা দিয়ে যাওয়া সংগঠন যাকাত ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা জাফর মাহমুদ বলেন, ‘যাকাত ফাউন্ডেশন রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও ঘর বাড়ি তৈরি করে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু সরকার আমাদের সেটি করতে অনুমতি দিচ্ছে না।’

বিজেপি সরকার ‘মুসলিমবিরোধী রাজনীতিতে’ রোহিঙ্গাদেরও প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে বলে তার দাবি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি ভারত সরকারের এ নীতির সমালোচনা করেন এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এ আচরণকে ‘নোংরা’ বলে আখ্যায়িত করেন।

বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ এবং প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনের মুখপাত্র আবুল কালাম আলজাজিরাকে নিশ্চিত করেন, ভারত থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। তারা উখিয়ার একটি শিবিরে আছেন বলে তিনি জানান।

আবুল কালাম বলেন, ‘এ শিবির ইউএনএইচসিআর অর্থায়নে চলে। ভারত থেকে আগত রোহিঙ্গাদের খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।’

এদিকে বাংলাদেশে নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবুল মোমেন আলজাজিরাকে বলেন, তিনি শিগগিরই ভারত সফর করবেন এবং দেশটির সরকারের সঙ্গে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবেন।

Comments

comments