বাড়ছে গুম: হারিয়ে গেছে ৫৩৯ জন মানুষ

গত ২০ ডিসেম্বর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না ঢাকা-১৫ আসনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ড. রেজাউল করিমকে। ঐদিন সন্ধ্যা থেকেই তিনি নিখোঁজ। শুধু তিনি একা নন, তার ড্রাইভার ও গাড়িটিও নিখোঁজ। পরিবারের দাবী আইন শৃঙ্খলা সংস্থার লোকেরাই ড. রেজাউলকে অপহরণ করেছে এবং আটকে রেখেছে।

এরকম একটি দু’টি ঘটনা নয়। বাংলাদেশে নাগরিকদের গুম করে ফেলার এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতি চালু হয়েছে গত দশ বছরে। গুমের এই বিভীষিকা বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগে। গত দশ বছরে ৫৩৯ জন মানুষ বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছে। এদের বেশিরভাগেরই কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

মানবাধিকার সংস্থা আসক ও অধিকারের তথ্যানুসারে জানা যায় ২০০৯ সালে ৩ জন, ২০১০ সালে ১৮ জন, ২০১১ সালে ৩১ জন, ২০১২ সালে ২৬ জন, ২০১৩ সালে ৫৪ জন, ২০১৪ সালে ৮৮ জন, ২০১৫ সালে ৬৬ জন, ২০১৬ সালে ৯৭ জন, ২০১৭ সালে ৮৬ জন, ২০১৮ সালে অক্টোবর পর্যন্ত ৭০ জন মানুষ বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছে।

গুমের পর নির্যাতন ভোগ করে অল্প কয়েকজন যারা ফিরে এসেছেন তারা চুপ হয়ে গেছেন। কারা গুম করেছিল, কেন গুম করা হয়েছিল, গুম করে কোথায় তাদের রাখা হয়েছিল সে ব্যাপারে ভয়ে তারা টুঁ শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করতে পারছেন না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মানবতা বিরোধী অপরাধে দণ্ডিত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের হিসাবে দেশে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজের সংখ্যা আরো বেশি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনের অভিযোগ, এর সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই জড়িত। এর মধ্যে টাকার জন্যও মানুষ গুম ও খুনের শিকার হচ্ছে।

নিখোঁজ হওয়া ৫২৪ জনের নাম অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস কমিশনের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের কেউ বাসা থেকে বা অফিস থেকে বেরিয়েছিলেন। কেউ বাসাতেই স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মায়ের সাথে ছিলেন। কখনো সাদা পোশাকে, কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক পরিচয় দিয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা তাদের তুলে নিয়ে যায়।

এখানে গুমের যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে তা হলো রাষ্ট্র কর্তৃক অপহরণের তালিকা। যাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন ফিরে এসেছেন বা তাদের পাওয়া গিয়েছে। কিছু মানুষের লাশ পাওয়া গিয়েছে। আর বাকীদের কোন খবর নেই। এদের বেশিরভাগই রাজনীতির সাথে জড়িত।

পুলিশ সদরদপ্তরের রিপোর্ট অনুসারে গত দশবছরে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৭৫৫০টি। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৮০০ জন, ২০১০ সালে ৮৮১ জন। ২০১১, ২০১২ এবং ২০১৩  সালে ৮৭০ জন করে অপহৃত হয়েছে। ২০১৪ সালে ৯২২ জন, ২০১৫ সালে ৮০৬ জন, ২০১৬ সালে ৬৩৯ জন, ২০১৭ সালে ৫০৯ জন, ২০১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত ২৮৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দশ বছরের অপহরণের চিত্র

বাংলাদেশে টাকার জন্য অপহৃত হওয়া বা গুম হওয়া নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রায় প্রতিদিনই অনেক মানুষ হারিয়ে যায়। কিছুদিন গুম করে রাখার পর তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। এই কাজটা আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যেমন করছে তেমনি করছে থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ। এরকম একটি অপহরণ চক্র নিয়ে প্রতিবেদন করেছে প্রথম আলো।

গুম ও ক্রসফায়ার নিয়ে করা জানা যায় বাংলাদেশের এমন কোন থানা অবশিষ্ট নেই, যে থানার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ নেই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি কাউকে গ্রেফতার করে তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে উপস্থাপন করার কথা। অথচ গত দশ বছরে যেসব রাজনৈতিক ব্যাক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের বেশিরভাগকেই তিন-চারদিন গুম করে রেখে তারপর আদালতে হাজির করা হয়েছে। এই সংখ্যা লক্ষাধিক। আর যেসব ব্যক্তি গুম হয়েছেন বা ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন তাদের কথাতো বাদই।

সরকারের পক্ষ থেকে মানুষ গুম হওয়ার কথা শুরু থেকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে এসেছে গুম বলে কিছু নেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শিপা হাফিজা সঠিকভাবেই বলেছেন, অব্যাহতভাবে ঘটে চলা গুমের ঘটনা এই বার্তাই দিচ্ছে যে, দেশে আইনের শাসন বা সুশাসন বলে কিছু নেই। যে কেউ যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো জায়গা থেকে গুম হয়ে যেতে পারেন। কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি!

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১২ জুলাই আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনায় অভিযোগ করেছেন, ২০০৯ সালের পর বিভিন্ন সময় বিএনপির নিখোঁজ হওয়া ৫০০ নেতা-কর্মীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া ১০ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য অনুষ্ঠানে বিএনপি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের হারিয়ে যাওয়া ২৯ নেতা কর্মীর তালিকা প্রকাশ করেছে।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম হওয়ার বেশ কিছু দিন পর তাকে ভারতের শিলংয়ে উদ্ধার করা হয়। কে বা কারা তাকে সেখানে রেখে আসে। তিনি প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। বর্তমানে ভারতে তিনি অবৈধ অনুপ্রবেশের একটি মামলা মোকাবেলা করছেন। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছেন বাংলাদেশের র‍্যাব তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যেতে। জামায়াত নেতা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার একজন সাক্ষীর ব্যাপারেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

সুখরঞ্জন বালি নামে এক সাক্ষীকে ডিবি পুলিশ একেবারে প্রকাশ্যে একটি সাদা গাড়িতে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। এর বহুদিন পর তাকে পাওয়া যায় ভারতের দমদম কারাগারে। ভারতীয় আদালত তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ১১০ দিনের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উপরের নির্দেশে তার শাস্তির মেয়াদ শেষ হলেও তাকে ছাড়া হয়নি।

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গুম করা হয়। এটা বেশ আলোচিত গুম। আজ পর্যন্ত তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আলী ও সালাহউদ্দিন আহমেদের গুম হওয়ার আগে বিএনপির মহানগর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম গুম হন। ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল রাজধানীর উত্তরা থেকে গুম হন সিলেটের ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমেদ ও জুনেদ আহমেদ। সাদা পোশাকে একদল লোক তাদের তুলে নিয়ে যায়। আশুলিয়ার শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের গুমও বেশ আলোচিত ঘটনা।

তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকা সফরকালে বিভিন্ন বক্তব্যে বারবার আমিনুল ইসলাম ও ইলিয়াস আলীর গুমের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। গুমের পর নিহত আশুলিয়ার শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের লাশ পাওয়া গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের। তাদের ভাগ্যে যে কী ঘটেছে কেউ তা জানে না।

২০১২ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে ‘হানিফ পরিবহন’ বাস থেকে নামিয়ে গুম করে র‍্যাব। দুই ছাত্র ওয়ালীউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের আজ পর্যন্ত কোন খোঁজ নেই। ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল ছাত্রশিবিরের আদাবর থানার সভাপতি হাফেয জাকির হোসেনকে পুলিশ তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত কোন খবর পাওয়া যায়নি।

২০১৬ সালে গুম হওয়া ৯৭টি ঘটনার মধ্যে জামায়াত নেতা গোলাম আযম ও মীর কাসেম আলী এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে যথাক্রমে আমান আজমী, মীর আহমেদ বিন কাসেম ও হুম্মাম কাদের চৌধুরীর কথা বেশ আলোচিত। এই তিনজনকে নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া বহু প্রতিবেদন তৈরি করে। এর মধ্যে হুম্মাম ‘নিখোঁজ হওয়ার’ সাত মাস পর বাড়ি ফেরেন, যাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

বিএনপি কর্মী সাজেদুল ইসলাম সুমন, যিনি ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন। ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজনৈতিক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে গুম হন ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের ৫ কর্মী। তারা হলেন- সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট মোল্লা, ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি খালেদ হাসান সোহেল, ৭৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি আনিসুর রহমান খান, একই ওয়ার্ডের সহসাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব ও ৮০ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দল সম্পাদক মিঠু। ১১ দিন পর মুন্সীগঞ্জে নিয়ে আনিসুর রহমান, বিপ্লব ও মিঠুকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু এখনও খোঁজ মেলেনি সম্রাট ও খালেদের।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের মতে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেসব দেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহযোগিতায় গুমের ঘটনা ঘটছে, সেসব দেশে আদালত সবসময় ভুক্তভোগীদের পক্ষে সুবিচার করতে পারেন না। এতে করে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। দেশগুলোতে অপরাধ প্রবণতা বাড়ে।

বাংলাদেশে গুম এখন এক আতঙ্কের নাম। গুমের ঘটনা এতটাই বাড়ছে যে, অনায়াসেই বলা যায় দেশ গুমরাজ্যে পরিণত হয়েছে কিংবা এখন দেশে জাহিলি বা বর্বর যুগ চলছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থই এর কারণ। পরিণতিতে সমাজে ভীতি ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি একই দেশে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এটা কোনো সভ্য নাগরিকের কাম্য হতে পারে না।

Comments

comments