খুলনা-৫, অন্তর্কোন্দলে আওয়ামী লীগ, এগিয়ে জামায়াত প্রার্থী গোলাম পরওয়ার

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে আওয়ামী লীগ, ও জামায়াতের বেশ কয়েকজন প্রার্থী সক্রিয় রয়েছেন। ডুমুরিয়ার ১৪টি ও ফুলতলার ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে বিশাল এলাকা জুড়ে এ আসনের পরিধি। খুলনা জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা ডুমুরিয়া। এ উপজেলায় হিন্দু, মুসলমানের ভোট প্রায় সমান। যে কারণে আওয়ামী লীগ এই আসনটি তাদের শক্ত অবস্থান তৈরীর চেষ্টা করলেও ভোটের রাজনীতিতে এগিয়ে জামায়াতে ইসলামী।

বিগত ৫ জানুয়ারী নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ আসনটি দখলে রাখলেও এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অবস্থান বেশ মজবুত। তাছাড়া বিগত দু’টি নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নও পেয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন এ আসনে প্রার্থী দেবে বলে জানা যাচ্ছে।

বিএনপি জোটগত নির্বাচন করলে প্রার্থী হতে পারেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। ২০০১ সালের নির্বাচনে বর্তমান প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে হারিয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী ছিলেন। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণে ৪১.৩ শতাংশ ভোট পেয়েও হেরে যান তিনি। প্রায় এক ডজন মামলা মাথায় নিয়ে বারবার কারাবরণ ও আত্মগোপনে থেকেও সুযোগ পেলেই এলাকায় এসে এলাকাবাসী সঙ্গে দেখা করে যান তিনি। বিশেষ করে কুরবানির ঈদের দিন প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজ এলাকায় কেন্দ্রীয় ঈদগাহ্‌ ময়দানে নামাজে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দিয়ে অনেকটা তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার বলেন, সংসদ নির্বাচন জোটবদ্ধভাবেই হবে। সেক্ষেত্রে এ আসনটি জামায়াত পাবে। তিনি দাবি করেন, সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিহ্নিত চরমপন্থিদের দমন করে এলাকার উন্নয়ন করেছি। বর্তমান বিনাভোটে এমপি এলাকায় নিয়োগ বাণিজ্য, ঘের দখল, ইটের ভাটা দখল ও তার সীমাহীন দুর্নীতি এলাকায় এখন ওপেন-সিক্রেট। জনগণ সুযোগ পেলে এ সব অপকর্মের জবাব ব্যালটের মাধ্যমেই দেবে।

এদিকে আওয়ামী শিবিরে দলীয় কোন্দল তুঙ্গে। খুলনা-৫ আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী ডুমুরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপি। তিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে কথিত বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন। পরে সরকারের মন্ত্রী পরিষদের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর অসহায় ও দুস্থদের মাঝে ছাগল বিতরণ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি ছাগল মারা যায়। এ সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় স্থানীয় এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মন্ত্রীর এক অনুসারীর তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা করা ও সাংবাদিক গ্রেপ্তার হওয়ায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এতে নারায়ণ চন্দ্র দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। আর এতেই দলের স্থানীয় অন্যান্য প্রভাবশালী নেতারা দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের জেলা সহ-সভাপতি প্রফেসর ড. মাহাবুব উল ইসলাম। তিনি বিগত নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে পাননি। কিন্তু মাঠ ছাড়েননি।

এদিকে গুটুদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রবর্তন সম্পাদক নাট্য অভিনেতা মোস্তফা সরোয়ার দলের ভেতরে তরুণ নেতা হিসেবে ডুমুরিয়া এলাকায় অবস্থান তৈরি করেছেন। বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রতিমন্ত্রীর অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় দলের মাঠপর্যায়ে তরুণ নেতাকর্মীরা তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মোস্তফা সরোয়ার বলেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন দলের পরীক্ষিত ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের হাতেই দলীয় প্রতীক নৌকা তুলে দেবেন। তাই আমার বিশ্বাস তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতামতের মূল্যায়নের কারণেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি দলীয় মনোনয়ন পাবো।

এছাড়া জাতীয় পার্টি খুলনা-৫ আসনে আবদুল লতিফ জমাদ্দারকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এ আসনে মাওলানা মুজিবুর রহমানকে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে।

অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারের মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ

খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেছেন। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তার পক্ষে সোমবার দুপুরে খুলনার রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে এ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আমিনুল ইসলাম, মুন্সি মইনুল ইসলাম, এডভোকেট ফিরোজ কবীর, হোসাইন কবীর প্রমুখ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ আসনের প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুতি নিয়েছেন সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তার পোস্টার ও প্যানা দেখা গেছে। স্বাধীনতার পর থেকে ডুমুরিয়া-ফুলতলা আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর এমপি নির্বাচিত হওয়া একটা প্রথা হয়ে গিয়েছিল এ আসনে। অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ৪ দলীয় জোটের মনোনয়ন নিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সে প্রথা ভেঙ্গে ফেলেন। এবারও তিনি এ আসনে প্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন।

ফুলতলা উপজেলার শিরোমনি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান মিয়া গোলাম পরওয়ার অনার্সসহ মাস্টার্স করেন বাণিজ্য বিষয়ে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৪ সালে জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমেই তার রাজনীতিতে হাতে খড়ি। ১৯৭৭ সালে তিনি ছাত্রলীগ ত্যাগ করে ইসলামী ছাত্রনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। কর্মজীবনে দুই বছর ইসলামীয়া কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং কিছুদিন দৈনিক সংগ্রামের খুলনা ব্যুরো প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি খুলনা প্রেসক্লাবের নির্বাচিত কর্মকর্তা ছিলেন। ২০১০ সালের ৩০ জুন প্রথম তিনি গ্রেফতার হন। এরপর থেকে কয়েকবার তাকে জেলগেট থেকে এবং বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করে কারাগারে আটক রাখা হয়। মিয়া গোলাম পরওয়ার ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে খুলনা-৫ আসনে এমপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু ২০০১ সালে এমপি পদে নির্বাচন করে বিজয়ী হন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, তিনি এমপি থাকার ৫ বছরে দুই উপজেলায় ৩২৫ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়। এর মধ্যে ডুমুরিয়ায় দুইশ’ ২০ কোটি টাকা এবং ফুলতলা উপজেলায় ৯৮ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার কাজ হয়। ইতোপূর্বে এ এলাকায় এত বেশী উন্নয়ন কাজ হওয়ার নজীর নেই। এসব উন্নয়ন কাজের মধ্যে ছিল নতুন পাকা রাস্তা নির্মাণ, ইটের সোলিং বসানো রাস্তা নির্মাণ, ব্রিজ, কালভার্ট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, মসজিদ ও মন্দির নির্মাণ ও সংস্কার, গভীর নলকূপ স্থাপন এবং বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন। তিনি বলেন, খুলনা থেকে ডুমুরিয়া হয়ে শরাফপুর বাস লাইন চালু, ডুমুরিয়ায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন, রঘুনাথপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্র ও চুকনগর পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, ডুমুরিয়া হেলথ কমপ্লেক্সে নতুন এ্যাম্বুলেন্স প্রদান, ফুলতলা হাসপাতাল ৫০ বেডে উন্নীতকরণ ও সেখানে ৩০০এমএম এক্সরে মেশিন প্রদান এবং ফুলতলা উপজেলায় এসেনশিয়াল ড্রাগসের একটি ফ্যাক্টরী স্থাপন করা হয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে যথেষ্ট পরিশ্রম আমাকে করতে হয়েছিল। এছাড়া ফুলতলা উপজেলার কৃষকদের প্রতি শতক জমির খাজনা ২২ টাকা থেকে কমিয়ে দুই টাকা করার কাজটিও আমি মহান আল্লাহর রহমতে করতে পেরেছিলাম। তার কার্যক্রমের ফলে তিনি জনপ্রিয়তাও অর্জন করেন। তার জনপ্রিয়তাও তার কারাবাসকে দীর্ঘায়িত করেছে বলে মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান।

তিনি এলাকাবাসী আমাকে পুনরায় নির্বাচিত করলে সন্ত্রাস-সহিংসতার অবসান করে সম্প্রীতি ও সৌহার্দের পরিবেশ সৃষ্টি, সকল ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও অবাধে ধর্ম পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করা, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষা ও কল্যাণে ভূমিকা পালন ও শিক্ষার উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালনসহ এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণের একগুচ্ছ পরিকল্পনা আমার রয়েছে।

Comments

comments