রক্তাক্ত ২৮ থেকে আজকের বাংলাদেশ

আবরার শাহরিয়ার

আজ থেকে একযুগ আগের কথা। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র পল্টন ময়দানে বাম মদদপুষ্ট আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে যে মানুষ হত্যার মিশনে নেমেছিল তা জাতির সামনে আজও স্পষ্ট। পৈশাচিক কায়দায় জীবন্ত মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার পর লাশের উপর নৃত্য করার সে নির্মম দৃশ্য বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

আর সেই ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনীতিতে লগি-বৈঠা দিয়ে বর্বরতার যাত্রা শুরু করে আজ অবধি চলছেই। মানবাধিকার লুন্ঠন, গণহত্যা, গুম, ধর্ষণ, গণতন্ত্র হত্যা, কিংবা জনগণের বাক-স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার যে অশুভ প্রতিযোগীতা চলছে তা বোধকরি ২৮ অক্টোবরেই জন্ম নিয়েছে।

লগি-বৈঠা দিয়ে বর্বর হত্যাকান্ডের পর ১/১১ এর বিতর্কিত সেনা সমর্থিত সরকার গঠন করে ২০০৯ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। জনগণের প্রত্যাশা কে ভুল প্রমাণ করে ক্ষমতায় আসার পর সরকারের উদাসীনতা কিংবা কারো কারো মতে প্রত্যক্ষ মদদেই পিলখানায় ৫৭ জন চৌকস সেনা অফিসারকে হত্যা করা হয়।

এসব হত্যকান্ডের মাধ্যমে মূলত দেশের সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে ক্ষমতায় থাকার চক্রান্ত করা হয়েছিলো। এরপর সাভারে রানা প্লাজা ভেঙে পড়ে ১১শ’র বেশি পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ছিল শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব-ইতিহাসেরই অন্যতম ভয়াবহ শিল্প-দুর্ঘটনা। যার পেছনে ক্ষমতানসীন সরকারের উচ্ছিষ্টভোগী স্বার্থান্বেষী চক্রের যোগসূত্র প্রমাণিত হয়েছে।

তারপর থেকে টিঁপাইমুখ বাঁধ, পার্বত্য এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার, এশিয়ান হাইওয়ে এবং টাস্কফোর্সসহ স্বার্থপর প্রতিবেশী ভারতের সাথে নানা ধরনের গোপন চুক্তি আজও বাংলাদেশ ভুলেনি।

ওপারের ইশারায় কথিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারের নামে প্রহসন করে আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীসহ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির রায় দেয়। রায়ের প্রতিবাদে যখন সারাদেশে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা রাজপথে নেমে এসেছিল তখন তাদের উপর যে বর্বর গণহত্যা চালানো হয়েছিল বাংলার প্রতিটি রাজপথ এখনো তার সাক্ষ্য বহন করে।

এরপর ৫ই মে রাতের আধারে হেফাজত ইসলামী এর নেতা-কর্মীদের উপর নৃশংস বর্বরভাবে যে হত্যাকান্ড চালানো হয়েছিল বাংলার মানুষ আজও তার সাক্ষী হয়ে আছে। এ সময় এই নৃশংস হত্যাকান্ড সরাসরি সম্প্রচার করায় জনপ্রিয় দিগন্ত ও ইসলামী টিভি বন্ধ করে মানুষের বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার এক নির্লজ্জ দৃষ্টান্তও স্থাপন করে আটাশের সেই লগি-বৈঠাধারী বাহিনী।

শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয় দেশের সাধারণ ছাত্রসমাজ যখন নিজের অধিকার আদায়ের জন্য কোটা সংস্কারের দাবীতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তাদের আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে লেলিয়ে দেওয়া হলো হাতুড়ি বাহিনী। রক্তাক্ত হলো শাহবাগ, শহীদ মিনারসহ সারাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এতবেশি রক্তাক্ত হয়নি। গ্রেফতার করা হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। গুম করা হয় আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের। ভাংচুর করে জ্বালিয়ে দেয়া হয় হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবন।

এরপর বাড়িতে ফেরার অপেক্ষায় থাকা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মমভাবে চালিয়ে দেয়া হলো গাড়ি। নিহত হলো দুই শিক্ষার্থী। কিন্তু এ নিয়ে কোন প্রকার দুঃখ প্রকাশ না করে উল্টো মন্ত্রী মশাইয়ের হাস্যরসে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নেমে আসলো রাজপথে। শুরু হলো নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন। রাজধানীর ঝিগাতলাসহ রাজধানীর অলিগলিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর লেলিয়ে দেওয়া হলো দলান্ধ পুলিশ ও হেলমেট বাহিনী। আওয়ামী লীগ আফিসে স্কুল ছাত্রীদের আটক রেখে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়। যদিও এসব ঘটনা গুজব বলে পার পেতে চেয়েছে ক্ষমতাসীন সরকার।

সারাদেশের গুম, ধর্ষণ চলছে পাল্লা দিয়ে। শুধু কোটা সংস্কার আন্দোলন নেতা-কর্মীদের নয় বিরোধী দলসহ সাধারণ মানুষকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গুম করা হয়। কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয় বিরোধী মতের নেতা-কর্মীদের।

বাংলাদেশ আজ সার্বিকভাবে পরিনত হয়েছে গুম, হত্যা ও ধর্ষণের রাজ্যে। রক্তাক্ত আটাশে যারা লগি-বৈঠা দিয়ে এই ফ্যাসিবাদী রাজ্যের উদ্ভব ঘটিয়েছিল, আজ তারাই হেলমেট বাহিনী, হাতুড়ি বাহিনী এমনকি অন্তর্বাস বাহিনীতে রূপ নিয়েছে। রক্তাক্ত আটাশ থেকে যে বাংলাদেশ মানবতা, মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হারিয়েছে, তা কবে নাগাদ ফেরত আসবে সেটিই এখন চিন্তার বিষয়। আটাশে অক্টোবরে রাজপথে মৃত মানুষের লাশের উপর নৃত্যের মাধ্যমে যে মানবতার মৃত্যু হয়েছে, সে মানবতা আবারো জেগে উঠুক বাংলার প্রতিটি প্রান্তে। সারাদেশে মানবতার জন্য যে হাহাকার উঠেছে তা সত্যিই সহ্য করার মত নয়।

Comments

comments