দুর্নীতির ভারে ভেঙে পড়লো কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটক!

কেরাণীগঞ্জ: ঢালাইয়ের মাত্র চারদিনের মাথায় ধসে পড়ল কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকের ছাদ। এতে ফটক নির্মাণকাজে নিয়োজিত অন্তত ৯ শ্রমিক আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মাইনুদ্দিন, রাজ্জাক, হারুন ও ফারুককে শেরেবাংলা নগর জাতীয় অর্থোপেডিকস ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আহত অপর পাঁচ শ্রমিক সেলিম, রিপন, হান্নান, সোহরাব ও ইউনুছকে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড ও কেরানীগঞ্জের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। অধিকাংশ শ্রমিকের বাড়ি ফরিদপুরে।

১৫/১৬ শ্রমিক মিলে গতকাল রবিবার সকাল ৯টার দিকে কেরাণীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকের ওপর দুটি ভিমে নতুন করে ঢালাই দিতে গেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে প্রথমে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করেন।

মিটফোর্ড হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি শাখার দায়িত্বে ডাক্তার লিটন সাহা জানান, প্রথমদিকে ছয়জন রোগী ভর্তি হয়েছে।

আহত নির্মাণ শ্রমিক আব্দুর রাজ্জাক জানান, সকালে ছাদের উপর ঢালাইয়ের কাজ করার সময় হঠাৎ করে আমাদের শরীরের ওপর ছাদ ভেঙে পড়ে। এতে কোমর ভাঙে তার। মাইনুদ্দিন জানান, সকালে ছাদে ভিমের ঢালাইয়ের কাজ করছিলাম। এরপর কীভাবে কী হয়েছে আমি জানি না। নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করি। তার বাঁ পায়ের হাড় ভেঙে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙা অংশে আধা ইঞ্চি রড দেওয়ার কথা থাকলেও মাত্র তিন সুতা রড ব্যবহার করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গণপূর্ত বিভাগের অধীনে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কারাগারের প্রধান ফটক ও প্রধান সড়কঘেঁষা সীমানা প্রাচীরের কিছু অংশের নির্মাণকাজ পান স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম রনি। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কার্যাদেশ পাওয়ার পর পরবর্তী আট মাসে ফটকটি নির্মাণ করার কথা থাকলেও তা গত ১৬ মাসেও এটি নির্মাণ করতে পারেনি। রনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। নিজেকে গোপালগঞ্জ টুঙ্গীপাড়ার বাসিন্দা বলে পরিচয় দেন। যোগাযোগ করলে সাইফুল ইসলাম রনি জানান, আমি রোগী নিয়ে চিকিৎসায় ব্যস্ত আছি, আপনাদের পরে সকল তথ্য দেওয়া হবে।

অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণের শুরু থেকেই নিম্নমানের ইট, বালু ছাড়াও চিকন রড ও প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প পরিমাণ সিমেন্ট ব্যবহার করে আসছিল যুবলীগ নেতার এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কমিশন বাণিজ্যের কারণে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি দেখলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যে কারণে এ দুর্ঘটনা।

কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক বলেন, নিম্নমানের ইট, সিমেন্ট ও বালুসহ বিভিন্ন মালামাল ব্যবহার করায় ছাদটি ভেঙে পড়েছে।

এ ব্যাপারে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী উজির আলী ও সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, ধসে পড়ার পেছনে ডিজাইন ত্রুটি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার কিংবা কনস্ট্রাকশন সমস্যা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। তা তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিব। তদন্তের পরই কেবল সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করা সম্ভব।

প্রধান ফটক নির্মাণ ছাড়াও কেরানীগঞ্জ মূল কারাগার নির্মাণে অনিয়ম ও মহাদুর্নীতি করে ঠিকাদারি এ প্রতিষ্ঠান। এতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের আগেই বন্দি সেল, নিরাপত্তা প্রাচীরসহ বিভিন্ন ভবনে অসংখ্য ফাটল দেখা দেয়।

তখনকার স্বরাষ্ট্র সচিব ড. মোজাম্মেল হক খান কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে গিয়ে একটি ইট মাটিতে ফেললে সেটি ভেঙে খান-খান হয়ে যায়। নিম্নমানের ইট ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করায় সচিব চরম বিব্রত হন। তদন্ত কমিটির আশঙ্কা ছিল এর পরতে পরতে দুর্নীতির কারণে দুর্বল গাঁথুনির এ কারাগার ভূমিকম্পে কারাবন্দি ও কারা সদস্যদের জন্য মারণফাঁদ হতে পারে।

জানা গেছে, সামান্য বাতাসে ভেঙে পড়ে কারা অভ্যন্তরের বিদ্যুতের খুঁটি। তবে ঠিকাদারদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন দলের হওয়ায় এখানে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

সূত্র: আমাদের সময়

Comments

comments