ওসি পদায়নে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ নেন রেঞ্জ ডিআইজিরা

পুলিশের আইজির উপস্থিতিতে একজন এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিলেন। ওই কর্মকর্তা আইজিপির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, রেঞ্জ ডিআইজিরা ওসি পদায়নে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা করে ঘুষ নেন। আবার পুলিশ সুপাররা এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল পদায়নে ঘুষ নেন। ফলে এ ঘুষের টাকা উঠাতে গিয়ে ওসি থেকে শুরু করে নিচের পদের সদস্যরা মাদক বাণিজ্যসহ নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ফলে মাদকবাণিজ্য বন্ধ করা যায় না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাদক বাণিজ্য বন্ধ করতে হলে ওসি থেকে নিম্নপদে কর্মরতদের পদায়নে ঘুষ লেনদেন বন্ধ করতে হবে।

রোববার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে অনুষ্ঠিত ত্রৈমাসিক অপরাধ সভায় আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী সভাপতিত্ব করেন। আইজিপি হিসেবে গত ৩১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তার প্রথম এ ধরনের সভা। এতে সব পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি এবং পুলিশ সুপার উপস্থিত ছিলেন।সভায় ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও জোনের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার উল্লিখিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কনস্টেবল পদে নিয়োগেও পুলিশ সুপাররা মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন। ফলে শুরুতেই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একজন পুলিশ সদস্য চাকরিতে যোগ দেন। এ ধরনের অবৈধ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিপ্লব কুমার সরকার আইজিপির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ সময় তার বক্তব্যে হাততালি দিয়ে উপস্থিত কোনো কোনো কর্মকর্তা বাহবা দেন।

আইজিপি পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, জনগণের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে, পুলিশের কোনো কোনো সদস্য মাদকবাণিজ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট। এতে পুলিশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। এ ইমেজ পুনরুদ্ধারে পুলিশকে সব ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। আর যারা মাদকবাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের এ পথ থেকে সরে আসতেও কঠোর বার্তা দেন। তিনি আরো বলেন, কোনো ব্যক্তির দায় পুলিশ বাহিনী নেবে না। এর পরই উন্মুক্ত আলোচনায় ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার মাদকবাণিজ্যসহ পুলিশে নিয়োগ এবং পদায়নে রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের ঘুষ গ্রহণের তথ্য তুলে ধরেন। তিনিও বলেন, পদোন্নতিতেও অর্থের লেনদেন হয়। এর পরই আইজিপি বলেন, পুলিশে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং পদায়নে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হবে। আইজিপি দেশে বিরাজমান স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, সবার আন্তরিক সহযোগিতার ফলে আমরা একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হব। আইজিপি বলেন, জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পুলিশের অনন্য অবদান রয়েছে। বর্তমানে দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে আছে। জঙ্গিরা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সে জন্য সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। আইজিপি বলেন, আসন্ন কনস্টেবল নিয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। যাতে এ নিয়োগ নিয়ে কোনো ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত না হয়।

তিনি বলেন, সবাই মিলে চেষ্টা করলে আমরা সুষ্ঠুভাবে কনস্টেবল নিয়োগ সম্পন্ন করতে পারব।
সভায় অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৭ কোয়ার্টারের সার্বিক অপরাধ পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে সারা দেশে ৫২ হাজার ৪৪৬টি মামলা রুজু হয়েছে, যা গত জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৭ সময়ের তুলনায় কম। আলোচ্য সময়ে সারা দেশে খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন, চোরাচালান, সড়ক দুর্ঘটনা, গাড়ি চুরির মামলা গত কোয়ার্টারের তুলনায় কমেছে। আলোচ্য সময়ে ডাকাতি মামলা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সভায় অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন ও অপারেশনস) মো. মোখলেসুর রহমান, পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান, সিআইডির অতিরিক্ত আইজিপি শেখ হিমায়েত হোসেন, পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, এপিবিএনের অতিরিক্ত আইজিপি সিদ্দিকুর রহমান, রেলওয়ের অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আবুল কাশেম, ডিএমপির পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া, অতিরিক্ত আইজিপি মো. মইনুর রহমান চৌধুরী, শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি আবদুস সালাম, এসবির অতিরিক্ত আইজিপি মীর শহিদুল ইসলাম, অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Comments

comments