নববর্ষ ঘিরে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের তান্ডব

চৈত্রসংক্রান্তি ও পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে আয়োজন করা হয়েছে লোকসংগীত উৎসব ও কনসার্ট। এই আয়োজনকে ঘিরে প্রকাশ্যে চলে এসেছে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল।

গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত একটার দিকে উৎসবস্থলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের অনুসারী একদল নেতা-কর্মী ভাঙচুরের ঘটনা ঘটান বলে অভিযোগ আছে। পরে রাত তিনটা পর্যন্ত অনুসারী নেতা-কর্মীদের নিয়ে সেখানে মহড়া দেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের উদ্যোগে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহযোগিতায় দুই দিনব্যাপী (শনি ও রোববার) এ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের অভিযোগ, সংগঠনের সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও এ আয়োজন সম্পর্কে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। আর রব্বানী, সনজিত ও সাদ্দামের দাবি, শোভন পুরো বিষয়টি জানেন। অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের পর তিন নেতার অনুসারীরা মল চত্বরে জড়ো হতে থাকেন। ‘সন্ত্রাসীদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ বলে তাঁরা স্লোগান দেন।

গতকাল রাতে ঘটনাস্থলে থাকা ছাত্রলীগের একাধিক নেতা বলেন, এই উৎসবের স্পনসর কোমল পানীয়ের ব্র্যান্ড ‘মোজো’। উৎসবে সব মিলিয়ে ২০ লাখ টাকা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মূলত, এই টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়েই দ্বন্দ্ব। ছাত্রলীগের আরেকটি অংশ বলছে, মূলত ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে ‘কোণঠাসা’ করতেই অন্য তিন শীর্ষ নেতা একজোট হয়েছেন। এই অংশের দাবি, শোভন ছাড়া অন্য তিনজন নেতা হয়েছেন ‘সিন্ডিকেট’ থেকে। শোভন নেতা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দে। প্রধানমন্ত্রী শোভনকে অন্য তিনজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন বলে অন্য তিনজন তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে শোভনের হারের পেছনেও এই তিন নেতার তৎপরতাকে দায়ী করছে এই অংশ।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের উদ্যোগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহযোগিতায় দুই দিনব্যাপী চৈত্রসংক্রান্তি ও পয়লা বৈশাখ বরণ উৎসবের আয়োজন করা হয়। গতকাল উৎসবস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে ভাঙচুর করে ছাত্রলীগের বিবদমান একটি পক্ষ। ছবি: সংগৃহীত

গতকাল রাতের অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনার বিষয়ে ছাত্রলীগের তিন শীর্ষ নেতার একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের আগে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের বাসায় একটি সভা হয়েছে। সেই সভার নির্দেশ অনুযায়ীই তাঁর নেতা-কর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। ডাকসু নির্বাচনে হারের ‘হতাশা’ থেকেই শোভন এসব করছেন বলে দাবি করেন ওই নেতা।

প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা বলেন, শুক্রবার রাত একটার দিকে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আতিকুর রহমান খান, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন রহমান, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইউসুফ উদ্দীন খান, কবি জসীমউদ্দীন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আরিফ হোসেন, অমর একুশে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এহসান উল্লাহ, মুহসীন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সানী ও স্যার এফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারের নেতৃত্বে মল চত্বরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়। তাঁরা সবাই ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের অনুসারী।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন, নিজেদের মধ্যে আলাপ ও নেতা-কর্মীদের নিয়ে মহড়া শেষে রাত তিনটার দিকে নেতা-কর্মীদের হলে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিন নেতা। হলে ফিরে কারও সঙ্গে বিবাদে না জড়ানোর নির্দেশও দেন তাঁরা। নেতা-কর্মীদের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি শোভনকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘যাঁরা ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করেন, তাঁরা মুজিব আদর্শের সৈনিক হতে পারেন না। এ ধরনের ছাত্রলীগ আমরা চাই না। এর বিচার না হলে আমি সনজিত চন্দ্র দাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করব।’

তবে পরে শোভনের অনুসারী স্যার এফ রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারের ৪০৯ নম্বর রুম ভাঙচুর করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের অনুসারীরা এই ভাঙচুর করেছেন বলে অভিযোগ করেন মাহমুদুল হাসান তুষার। এ ছাড়া সাগর রহমান নামে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে মারধর করা হয়েছে। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন গতকাল রাতে বলেন, ‘ছাত্রলীগের ব্যানারে একটি প্রোগ্রাম হচ্ছে, অথচ আমি সংগঠনের সভাপতি হয়েও কিছুই জানি না—এ নিয়ে আমার মনে কিছুটা ক্ষোভ আছে। তবে মল চত্বরে কারা আগুন দিয়েছেন, আমি জানি না। আমি কাউকে এ ধরনের নির্দেশ দিইনি। তিন শীর্ষ নেতা আমাকে যেভাবে দোষারোপ করছেন, তাতে আমি মর্মাহত। দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে তাঁরা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করছেন।’

Comments

comments