পরিবার প্রথা ও কিছু কথা

হানিফ সংকেত

আমাদের এই দেশটা যেমন ছায়া-সুনিবিড় তেমনি পিতা-মাতা, ভাই-বোন, বন্ধুর মায়ায় ভরা। আর এই ছায়া-মায়া ঘেরা মাটি থেকেই জন্ম নিয়েছে আমাদের সংস্কৃতি। গানে শুনেছি, ‘বটবৃক্ষের ছায়া যেমনরে-মোর বন্ধুর মায়া তেমনরে…’। এই বটবৃক্ষের শিকড়ের মতোই আমাদের শিকড় এই মাটিতেই বিস্তৃত। আর আমাদের এই সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একান্নবর্তী পরিবার। বটবৃক্ষের মতোই সেই পরিবারে একজন পরিবারপ্রধান থাকতেন; যার নির্দেশ এবং সিদ্ধান্তেই চলত পরিবার। তার নিয়ন্ত্রণেই একসঙ্গে থাকা, এক হাঁড়িতে রান্না করা, একই সঙ্গে খাওয়া হতো। তখন মায়ের আর বাড়ির কর্তার শাসনে থাকত ভালোবাসার টান। আসলে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কগুলো অত্যন্ত মধুর। যার সঙ্গে জড়ানো থাকে স্নেহ-মায়া-মমতা-আদর-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা। সবকিছুই আমাদের হৃদয়ের আবেগে সিক্ত। কিন্তু এখন সেই আবেগ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। শিথিল হয়ে যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। বাঙালি সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্য যেন হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের বিবর্তনে। অথচ আমাদের এই পারিবারিক বন্ধন আমাদের গর্বের, অহংকারের, ঐতিহ্যের; যা পৃথিবীর আর কোনো উন্নত দেশেই খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের বাঙালিদের গৌরবময় ঐতিহ্য আছে যৌথ পরিবারে।

সমাজ গবেষকদের মতে, গ্রামাঞ্চলে এখন ১০ ভাগেরও কম যৌথ পরিবার টিকে আছে। আর শহরে তো চোখেই পড়ে না। এক ঘর এক পরিবারের স্বার্থ ছায়ায় আবদ্ধ এখনকার পরিবার। পারিবারিক আবেগ এখন সময়ের বেগ যন্ত্রণায় যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। এখন এক ঘরজুড়ে থাকেন মা-বাবা ও তাদের দুটি সন্তান। সন্তানরা ঘরের কোণে, খাটে কিংবা সোফায় বসে হাতে প্রযুক্তির উপহার ট্যাব বা মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে অধিকাংশ সময়। এসব পরিবারে দাদা-দাদি, নানা-নানীর স্থান সংকুলান হয় না। বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছাড়া বসবাসে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে এখনকার ছেলেমেয়েরা। এখনকার সচ্ছল বাবা-মা সেটা বুঝতে পেরে নিজেরাই সন্তানের বিয়ের আগে থেকেই তার জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা করে রাখেন।

এখন সবকিছুই পাল্টে গেছে। আগে সন্তানরা অনেক রাত জেগে লেখাপড়া করত, মা গ্লাস ভরা দুধ নিয়ে রাখতেন পড়ার টেবিলে। আর এখন ছেলেমেয়েরা কখন ঘুমায়, কখন জেগে থাকে বাবা-মাও বুঝতে পারেন না। বরং এখন রাত জাগলে বাবা-মা টেনশনে ভোগেন, রাত জেগে সন্তান কী করছে? না জানি ইউটিউবে কী দেখছে কিংবা ফেসবুকে কার সঙ্গে চ্যাটিং করছে। আগে ছেলেমেয়েরা বাবার সঙ্গে বাজারে যেত যে কোনো মাছ, তরিতরকারির নাম জানত, চিনত। এখন তো বাজারে যাওয়ার সময়ই হয় না, যে কারণে অনেকেই অনেক মাছের নাম, শাক-সবজির নামই জানে না, চেনা তো দূরের কথা। বিদেশি ফলের নাম জানলেও জানে না দেশীয় অনেক ফলের নাম। চেনে না সফেদা, লটকন, করমচা, গোলাপজাম কিংবা ডেউয়া। নানান জাতীয় কেক চিনলেও চেনে না দেশীয় পিঠা, জানে না নাম। মেয়েরা আগে রান্নাঘরে গিয়ে মাকে সাহায্য করত, এখন তো অধিকাংশ মেয়েই রান্নাঘরে যায় না। সময় কোথায়? আগে তো স্ত্রীরা স্বামীকে রান্নাবান্না করে খাওয়াত, এখনকার স্বামীদের কী হবে? একান্নবর্তী পরিবারের যে বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ বাবা-মা ছাড়াও চাচা, মামা, খালা-খালু, ফুফা-ফুফু, বেয়ান-বেয়াই, দেবর, ননদ, শালা, দুলাভাই এসব সম্পর্কেও ধারণা নেই অনেকের। আর ধারণা থাকবেই বা কী করে? যারা জানে না তারা দেখে শেখে কিন্তু এখন দেখবে কোথায়, শিখবেই বা কী করে?

আমাদের সংস্কৃতির মুরুব্বিদের দুষ্কৃতির কৃতিত্বে নাটক থেকে পারিবারিক পরিবেশ পরিত্যক্ত হচ্ছে। আমাদের টিভি নাটকগুলোতে এখন এই পারিবারিক ঐতিহ্যই তো খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন মা-বাবার চরিত্র তো দেখাই যায় না। নাটক হয় নায়ক-নায়িকা আর মোবাইল ফোন নিয়ে। একসময় টিভি নাটকে দেখেছি সকালে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত। কোনো দৃশ্যে দেখা গেছে গৃহকর্তা বা কর্ত্রী নামাজ শেষে দুই হাত তুলে মোনাজাত করছেন। বিভিন্ন সময়ে পরিবারের সবাই বাড়িতে একত্রিত হচ্ছেন। কেউবা মামাবাড়ি, ফুফুবাড়ি যাচ্ছেন। সেখানে মামা-মামি বা ফুফুর সঙ্গে দৃশ্য হচ্ছে নানান পারিবারিক বিষয় নিয়ে। আর এখন বিদেশি সিরিয়ালের অনুকরণে এসব পারিবারিক সম্পর্ক কুটনামিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে অনেক পরিবার সাংস্কৃতিক হামলার শিকার হচ্ছে। অতি কৃত্রিম মোহে ভেঙে যাচ্ছে অনেক সুখের সংসার।

মোট কথা ভিনদেশি টিভি সিরিয়ালগুলো আমাদের পারিবারিক সম্পর্কে সিরিয়াল কিলারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রায়ই পত্রপত্রিকায় ছাপা হয় পরকীয়ার জেরে ঘর ভাঙা, আত্মহত্যা, এমনকি হত্যা পর্যন্ত নানান খবর। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে বিদেশি বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত চাকচিক্যময় কৃত্রিম সামাজিক দ্বন্দ্ব-কলহের চালচিত্র। যা দেখে আমরা শিখছি কুটনামির কূট, পরকীয়া ও সংসার ভাঙা। এর প্রভাবে ভাঙছে অনেক সংসার বা ঘটছে অনেক দুর্ঘটনা। তবে তারকা সংখ্যা বিচারে সাধারণ মানুষের চাইতে মিডিয়াতেই যেন সংসার ভাঙা বা বিচ্ছেদের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে আশঙ্কাজনক হারে। তারকারা সাধারণ মানুষের আদর্শ। আর তারকা বিচ্ছেদের খবর খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ তারকাদের বিভিন্ন বিষয়কে অনুকরণ করে- তাদের চালচলন, পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ, জীবন-যাপন ইত্যাদি। কিন্তু যে হারে এসব তারকার বিচ্ছেদ, পরকীয়া ও তৎপরবর্তী পত্রপত্রিকায় উভয়ের সাক্ষাৎকারে নিজেদের দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে সবিস্তার বর্ণনা দেখা যায়- তা যদি কেউ অনুকরণ করতে যায় তাহলে দেশে কটি সংসার টিকে থাকবে বলা মুশকিল। মিডিয়ার এই উন্মুক্ত যুগে এসব বিদেশি সিরিয়াল বা চ্যানেল দেখা বন্ধ করা যাবে না। কারণ এতে অনেক ভালো জিনিসও দেখানো হয়। আসলে আমাদের সচেতনভাবে নির্ধারণ করতে হবে আমরা কোনটা দেখব আর কোনটা দেখব না। আমাদের এই সচেতনতার ওপরও আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতির অনেক কিছু নির্ভর করবে। আর আমাদের নাটকগুলোয় পারিবারিক ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিযোগিতার বাজারে জয়ী হতে হবে।

অতীত এবং বর্তমানের পারিবারিক বন্ধন বা আবেগ-অনুভূতির বিষয়ে কোথায় যেন একটি চমৎকার লেখা পড়েছিলাম। লেখাটা ছিল এ রকম, ‘আগে সামাজিকতার কারণে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলে গাছ থেকে কলাপাতা কেটে এনে পাতার থালা বানিয়ে কাউকে খেতে দেওয়া হতো। সম্পর্ক ছিল পবিত্র এবং পাতার মতোই সবুজ। পরে মাটির পাত্র ব্যবহৃত হতে লাগল। আর সম্পর্কগুলোও চলে এলো একেবারে মাটির কাছাকাছি। কিছুদিন পর কাঁসা-পিতলের জমানা এলে, সম্পর্কগুলো ছয় মাসে মাজার চমকে চমকাতে লাগল কিন্তু যেদিন থেকে কাচের পাত্রে খাবার দেওয়া শুরু হলো সেদিন থেকেই অল্প আঘাতেই সম্পর্কগুলো ভাঙতে লাগল। আন্তরিকতা, আত্মীয়তা সব টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আর এখন তো শুধু কাগজ কিংবা থার্মোকলের পাত্রই ব্যবহার হয় অর্থাৎ ‘Just use & throw -ব্যবহার হয়ে গেছে ছুড়ে ফেলে দাও।’

আমাদের সম্পর্কগুলোও এখন কেমন যেন ওয়ান টাইম ইউজের মতো হয়ে গেছে। বছরে একবার দুবার দেখা হয় উৎসব বা শোকের সময়। এ ছাড়া কারও সঙ্গে কারও দেখা হয় খুব কম। সেই ওয়ান টাইম ইউজের মতো অর্থাৎ পরিবারে কারও বিয়ে-শাদি হলে কিংবা কারও মৃত্যু হলেই সবাইকে একসঙ্গে দেখা যায়। অন্য সময়ে সম্পর্কটা মুঠোফোনে আবদ্ধ থাকে। দেখা হওয়া দূরের কথা এই ফোনেই হঠাৎ কোনো প্রয়োজনে ফোন করলে কুশল বিনিময় হয়, তার পরই একগাদা ব্যস্ততার তালিকা দেখানো হয় উভয় পক্ষ থেকেই। এ এক নতুন সংস্কৃতি। মূলত এখনকার প্রজন্মকে সেভাবে দোষ দিয়ে লাভ নেই, তারা বেড়ে উঠছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গুরুজনদের নীতিহীন আচরণ, মিথ্যাচার ও দুর্নীতি দেখে। শিশুরা বড় হচ্ছে নিরানন্দ পরিবেশে, গৃহকর্মীর সান্নিধ্যে ফ্ল্যাট নামক আবদ্ধ জায়গায়। প্রাচীরঘেরা বাড়িতে নেই খেলাধুলার স্থান এবং পরিবেশ। অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির সান্নিধ্যে মানবিক মূল্যবোধের পরিবর্তে মানবিক মূল্যবোধহীন নির্বোধ ও বিবেকহীন হয়ে পড়ছি আমরা। খুব দ্রুত সময়ের সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে আমাদের জীবনযাপন, জীবনাচার। সেদিন আমার এক বন্ধু আমাকে একটি জোক পাঠিয়েছে। জোকটা হচ্ছে, ‘এখন গর্ভবতী মহিলাদের প্রতি ডাক্তারের পরামর্শÑ গর্ভবতী অবস্থায় কখনো নির্বাচনী ভাষণ শুনবেন না। তাহলে শিশু জন্মগত মিথ্যাবাদী হতে পারে।’

অনেকে মনে করেন, একান্নবর্তী পরিবার আর ধরে রাখা সম্ভব নয়। জাপানের মতো দেশে যৌথ পরিবারের সংখ্যা অনেক বেশি। সেখানে প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের প্রভাব অনেক বেশি। তবু সেখানে যৌথ পরিবার রক্ষায় মানুষকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই সচেতন করা হয়। আমাদের এখানেও তা সম্ভব। পারিবারিক আবেগ-অনুভূতি এবং সম্পর্ক অনেক কুপ্রভাব থেকে আমাদের মুক্ত রাখবে। সুচিন্তা ও সুবুদ্ধি বিকাশে সহায়তা করবে। অনেক মানুষের মধ্যে এখনো আবেগ-অনুভূতি এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি ভালোবাসার টান রয়েছে, আবার অনেকের নেই। প্রসঙ্গক্রমে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ২০১২ সালে প্রচারিত ‘ইত্যাদি’তে আমরা ৮০ বছর বয়সী শারীরিক প্রতিবন্ধী জীবনযোদ্ধা রফিকুল ইসলামকে দেখিয়েছিলাম। আপন সন্তানসহ তার প্রিয়জনরা এই পঙ্গু মানুষটিকে ছেড়ে চলে গেছে। সন্তানের শোকে একসময় তার স্ত্রীও পাড়ি জমান পরপারে। আর তাই নিজের চলাচলের হুইল চেয়ারটিকেই বানিয়েছেন জীবন ধারণের অবলম্বন। নিজেই যার নাম দিয়েছেন ‘জীবন সংগ্রাম স্টোর’। এই স্টোরে বসেই তিনি বিস্কুট, চিপস, চকলেট জাতীয় জিনিস বিক্রি করেন। এ থেকে যা হয় তাই দিয়ে কোনোরকম জীবন ধারণ করেন।

এখানেই একদিন তার ওপর দৃষ্টি পড়ে রিকশাচালক লোকমানের। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে যাওয়ার পথে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতেন তিনি বৃদ্ধকে। কখনো রিকশা থামিয়েই খোঁজখবর নিতেন। লোকমান এবং তার স্ত্রীর অনুরোধেই এই বৃদ্ধ আছেন এখন লোকমান পরিবারের সঙ্গে। রফিকুল ইসলামকে পেয়ে লোকমানের দুই ছেলে যেন ফিরে পায় তাদের দাদুকে। লোকমানের স্ত্রীও নিজের শ্বশুরের মতো যত্ন নেন রফিকুল ইসলামের। বর্তমান সমাজে এই চিত্র বিরল। স্বল্প আয়ের সংসার লোকমানের। তার পরও বললেন, আমরা যদি খাই, উনিও খেতে পারবেন।

নতুন এই পরিবারে এসে রফিকুল ইসলামও উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, ‘এদের সঙ্গে থেকে মনের শান্তিটা পাইতেছি।’

এই স্বার্থান্ধ সমাজে আমরা রফিকুল ইসলাম এবং লোকমানের কাছ থেকে কি কোনো শিক্ষাই নিতে পারি না? কিংবা সেসব সন্তান বাবা-মা নিজের সর্বস্ব বাজি রেখে যাদের বড় করেন, যারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছেড়ে চলে যায়, ছিঁড়ে চলে যায় সব ভালোবাসা, মমতার বন্ধন। তাঁরাও কি কোনো শিক্ষা নেবে?

আমরা যখন প্রায়ই দেখছি, পারিবারিক বন্ধনগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, নাগরিক জীবনে দেখা যায় একরাশ কষ্ট নিয়ে অনেক বাবা-মার স্থান হচ্ছে বয়স্ক নিবাসে। ঠিক সে সময় আনোয়ারা প্রমাণ করলেন দেশের মাটি, আপনজন ও রক্তের বাঁধন আসলে ছিন্ন হওয়ার নয়। ২০১৮ সালের মার্চে প্রচারিত ‘ইত্যাদি’তে আমরা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নেদারল্যান্ডসের নাগরিক এই আনোয়ারা বেগমের ওপর একটি প্রতিবেদন দেখিয়েছিলাম। তখন আনোয়ারা তার বিদেশের সুখের জীবন ছেড়ে ছুটে আসেন বৃদ্ধ পিতা-মাতার খোঁজে শিকড়ের টানে।

আনোয়ারা বলেন, ‘যদিও নেদারল্যান্ডসে আমি আমার পালক পিতা-মাতা, স্বামী এবং দত্তক কন্যাদের নিয়ে খুব সুখেই আছি তবু আমার অন্তর এখনো বার বার কেঁদে ওঠে বাংলাদেশে আমার বাবা-মা, স্বজনদের জন্য। মনে হয় তাদের পেলেই আমার জীবনটা পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।’

এবার আর একজন মাতৃভক্ত মানুষের কথা বলে শেষ করব এই লেখা। আর এই মানুষটির নাম ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদার। মাকে নিয়ে অনেক গান-কবিতা আমরা শুনেছি। আমাদের লোকগানে আছে, ‘বিদেশে বিপাকে যার ব্যাটা মারা যায়, পাড়া-পড়শি না জানিতে আগে জানে মায়…’ কিংবা ‘যার মাথায় নাই মায়ের পায়ের ছায়া, জগৎ সংসার ছাড়েরে তার মায়া…’, আমরা শুনেছি ‘মায়ের মতো আপন কেহ নাই’, ‘মা জননী নাইরে যাহার, ত্রিভুবনে তাহার কেহই নাইরে…’। আমরা পড়েছি মায়ের জন্য সারা রাত পানির গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বায়েজিদ বোস্তামির কাহিনি। পড়েছি মায়ের ডাকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাঁতার দিয়ে দামোদর নদ পাড়ি দেওয়ার ঘটনা। তার বিপরীতে আজ আমরা দেখছি বয়স্ক নিবাসে নির্বাসিত মায়ের কান্না। অবস্থাবান সন্তানের সময়ও হয় না মাকে একবার দেখতে আসবার, এমনকি উৎসবের দিনগুলোতেও।

ধীরেন্দ্রনাথের বাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রামে। বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছেন তার মা। আর অসুস্থ মায়ের সার্বক্ষণিক সেবা-যতœ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদার। মাঝে মাঝেই মাকে নিয়ে দীর্ঘ ১০ মাইল পাড়ি দিয়ে জিয়ানগরে পল্লী চিকিৎসকের কাছে যেতে হয় ধীরেন্দ্রনাথকে। প্রায় যোগাযোগবিচ্ছিন্ন চণ্ডীপুরে রাস্তাঘাট না থাকায় যানবাহনের কোনো ব্যবস্থাও নেই। কিন্তু মাকে তো চিকিৎসকের কাছে নিতেই হবে। আর ধীরেন্দ্রনাথের কাছে সৃষ্টিকর্তার পরেই তো মা। আর মায়ের স্থান তো মাথায়। মায়ের যেন কোনো কষ্ট না হয় তাই মাকে একটি টুকরিতে বসিয়ে মাথায় নিয়ে নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে সে প্রায়ই পাড়ি দেয় এই ১০ মাইল পথ। তার এই মাতৃসেবার বিষয়টি সে সময় বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এসব দেখে একটি প্রশ্ন উদয় হয়Ñ শিক্ষা কী? সে কি শুধুই বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন? সম্পদ কী? সে কি শুধুই অর্থবিত্ত অর্জন? যে পিতা-মাতার জন্য আমরা এই পৃথিবীর আলো দেখেছি, যারা আমাদের হাত ধরে চলতে-বলতে শিখিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে নিজে না খেয়ে আহার তুলে দিয়েছেন আমাদের মুখে সেই পিতা-মাতা কি সম্পদ নন আমাদের জীবনে? তাদের সেবা করতে শেখা কি শিক্ষা নয়? দরিদ্র ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদারের মাতৃভক্তির এই নিদর্শন থেকে কিছুই কি শিক্ষা নেওয়ার নেই আমাদের?

আমরা বলি, ব্যবহারেই বংশের পরিচয়। এ প্রবাদেই বোঝা যায়, পরিবার প্রথা কত প্রাচীন এবং সভ্যতার বিকাশে কত প্রয়োজনীয়। অনেকেই তাই বলেন, একটি পরিবার একটি বিশ্ববিদ্যালয়। আবার কথায় আছে, মানুষ গড়ার কারিগর সবার আগে আপন ঘর। অর্থাৎ পরিবার থেকেই শুরু হয় মানুষের শিক্ষা আর সুশিক্ষাই মানুষকে করে সৎ, আদর্শবান, চরিত্রবান।

‘স্নেহ-মমতায় প্রীতি শ্রদ্ধায়

জড়িয়ে পরস্পর

দুঃখ সুখ ভাগাভাগি করে

মানুষ গড়বে ঘর

এই তো নিয়ম জানি-

তবে কেন আজ ছোট ছোট এত স্বার্থের হানাহানি’

‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত এই গানের রেশ ধরেই বলতে চাই- ফিরে আসুক পারিবারিক বন্ধন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষের চোখ থেকে ঝরে পড়ুক অশ্রু নয়- স্নেহের আশিস। আমাদের প্রতিটি দিন হোক স্নেহ-ভালোবাসা-শ্রদ্ধায় ভরা আনন্দময় দিন।

লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব; পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী

Comments

comments