ইসলামে অমুসলিম নাগরিকদের দ্বীন-ধর্ম রক্ষার স্বাধীনতা

অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান

মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রে মুসলমান নাগরিকদের দ্বীন ধর্ম রক্ষার অধিকার যেমন ছিল তেমনি অমুসলিম নাগরিকদেরকেও দ্বীন ধর্ম ও আকীদা বিশ্বাস রক্ষা করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। তাদেরকে তাদের ইবাদত বন্দেগী করার জন্য সকল রকমের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। কোনো অমুসলিমকে কখনো তার দ্বীন ধর্ম ত্যাগ করে আকীদা বিশ্বাস পরিহার করে ইসলাম গ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়নি। কারণ আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেছেন,
لَآ إِكۡرَاهَ فِي ٱلدِّينِۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشۡدُ مِنَ ٱلۡغَيِّۚ فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَاۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ٢٥٦ ﴾ [البقرة: ٢٥
‘দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ [সুরা আল বাকারা:২৫৬]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
﴿ وَلَوۡ شَآءَ رَبُّكَ لَأٓمَنَ مَن فِي ٱلۡأَرۡضِ كُلُّهُمۡ جَمِيعًاۚ أَفَأَنتَ تُكۡرِهُ ٱلنَّاسَ حَتَّىٰ يَكُونُواْ مُؤۡمِنِينَ ٩٩ ﴾ [يونس: ٩٩]
আর যদি তোমার রব চাইতেন, তবে যমীনের সকলেই ঈমান আনত। তবে কি তুমি মানুষকে বাধ্য করবে, যাতে তারা মুমিন হয়? [সুরা ইউনুস:৯৯]

আল্লামা ইবন কাসীর প্রথম আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, ‘কাউকে তার আগের দ্বীন ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য বাধ্য করো না। কারণ ইসলাম সুস্পষ্ট, যুক্তি ও দলিল নির্ভর একটি দ্বীন। সুতরাং কাউকে ইসলামে প্রবেশ করাবার জন্য বাধ্য করার কোনো প্রয়োজন নেই।

মুফাস্সিরদের মতে আয়াতটি নাযিল হবার কারণ ইসলামের একটি মু’জিযা প্রকাশ করে। ইবন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেন, যদি কোনো মহিলার সন্তান না বাঁচত তখন সে মানত করত যে তার সন্তানটি বাঁচলে সে তাকে ইহুদী বানাবে। জাহেলী যুগে আনসারী মহিলারাও এ ধরনের কর্ম কা- করত। এভাবে কিছু আনসারী সন্তানও ইহুদী হয়ে যায়। যখন বনু নাযীরকে মদীনা হতে বহিস্কার করা হয়; তখন তাদের সাথে সেই আনসারী সন্তানরাও -যারা ইহুদী হিসেবে বেড়ে উঠে ছিল- বহিস্কৃতদের আওতায় পড়ল। তখন তাদের মা বাবারা বলল, আমরা আমাদের সন্তানদের ওদের মতো ইহুদী হতে দিব না। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াতটি নাযিল করলেন।

জাহেলী যুগের আনসারী মা বাবাদের তাদের শিশুদেরকে তাদের দ্বীন ধর্ম জাতিসত্ত্বা বিরোধী শত্রু ইহুদীদের ধর্মের অনুসর করতে বাধ্য করা সত্ত্বেও, বিশেষত যে কারণে শিশুরা ছোট কাল হতে ইহুদী হতে বাধ্য হয়েছিল তা সত্ত্বেও, সে সময় ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন মতবাদ গ্রহণকারীদের উপর যে চাপ প্রয়োগ করা হতো তা সত্ত্বেও; -যেমন রোমান সম্্রাজ্য যখন কেথলিক মতবাদ গ্রহণ করে; তখন বেশ কিছু কাল তার জনগণকে খ্রিস্টান ধর্ম ও মৃত্যু এই দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নেবার জন্য বাধ্য করা হয়। আর যারা তাদের কেথলিক মতবাদ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল তাদের প্রায় সবাইকে হত্যা করা হয়।

এসব সত্ত্বেও আল কুরআন ইসলাম গ্রহণ করার জন্য কাউকে বাধ্য করার বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই মুসলমানরা কখনো কাউকে তার দ্বীন ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হতে বাধ্য করেনি। বরং আল্লাহ যার হৃদয়কে ইসলাম গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত করেছেন, যে ইসলামের মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব দেখে ইসলামের প্রতি আগ্রহবোধ করেছে, যে সুস্পষ্টভাবে বুঝেশুনে ইসলামে দীক্ষিত হতে চেয়েছে, মুসলমানরা কেবল তাদেরকেই মুসলমান বানিয়েছে। আর যার হৃদয়কে আল্লাহ আন্ধ করে রেখেছেন, যার চোখ কানের উপর আল্লাহ মহর লাগিয়ে দিয়েছেন, তাকে বাধ্য করে মুসলমান বানালেও তাতে ইবন কাসীরের বক্তব্য মতে তার কোনো কল্যাণ হয় না। কারণ ঈমান মুসলমানের কাছে এমন কিছু বুলির নাম নয় যা আওড়ালে একজন মানুষ মুসলমান হয়ে যায়। এমন কোনো কর্মের নাম নয়; যা করলেই কোনো মানুষ মুসলমান হয়ে যায়। বরং ঈমানের ভিত্তি হচ্ছে হৃদয় ও মন থেকে পরিপূর্ণভাবে স্বীকৃতি দেয়া, আল্লাহর কাছে নিজেকে চূড়ান্তভাবে সমর্পণ করা।

এ কারণেই মুসলমানদের ইতিহাসে এমন কোনো সম্প্রদায়কে দেখা যায় নি যারা কোনো যিম্মিকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য বাধ্য করেছিলেন। স্বয়ং পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিকরাও এ কথা স্বীকার করেছেন।

অনুরূপভাবে ইসলাম অমুসলিমদের ধর্মশালা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নিদর্শনের মর্যাদা রক্ষা করেছে। বরং ইসলাম ঘোষণা করেছে যে যুদ্ধের অনুমতি দানের একটি কারণ হচ্ছে মানুষকে তাদের ধীন ধর্ম পালন ও ইবাদত বন্দেগী করার স্বাধীনতা দান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَٰتَلُونَ بِأَنَّهُمۡ ظُلِمُواْۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ عَلَىٰ نَصۡرِهِمۡ لَقَدِيرٌ ٣٩ ٱلَّذِينَ أُخۡرِجُواْ مِن دِيَٰرِهِم بِغَيۡرِ حَقٍّ إِلَّآ أَن يَقُولُواْ رَبُّنَا ٱللَّهُۗ وَلَوۡلَا دَفۡعُ ٱللَّهِ ٱلنَّاسَ بَعۡضَهُم بِبَعۡضٖ لَّهُدِّمَتۡ صَوَٰمِعُ وَبِيَعٞ وَصَلَوَٰتٞ وَمَسَٰجِدُ يُذۡكَرُ فِيهَا ٱسۡمُ ٱللَّهِ كَثِيرٗاۗ وَلَيَنصُرَنَّ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ ٤٠ ﴾ [الحج: ٣٩، ٤٠]
‘যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল তাদেরকে, যাদেরকে আক্রমণ করা হচ্ছে। কারণ তাদের উপর নির্যাতন করা হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে বিজয় দানে সক্ষম। যাদেরকে তাদের নিজ বাড়ী-ঘর থেকে অন্যায়ভাবে শুধু এ কারণে বের করে দেয়া হয়েছে যে, তারা বলে, ‘আমাদের রব আল্লাহ’। আর আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা দমন না করতেন, তবে বিধ্যস্ত হয়ে যেত খৃস্টান সন্ন্যাসীদের আশ্রম, গির্জা, ইয়াহূদীদের উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ- যেখানে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। [সুরা আল হজ্জ:৩৯-৪০]

ইতিহাসে দেখা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে নাজরানের খ্রিস্টানদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জিম্মায় তাদের দ্বীন ধর্ম তাদের উপাসানালয় তাদের ধন সম্পদ এর হেফাযতের গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছিল।

ওমর রা. এর খেলাফতের সময় ঈলিয়া বা আল কুদসবাসীকে তাদের দ্বীন ধর্ম রক্ষা ও তাদের উপাসনালয় রক্ষার গ্যারান্টি প্রদান করে চুক্তি করা হয়েছিল। সেই চুক্তিপত্রে ছিল, ‘এটা সেই পরিপত্র যার মাধ্যমে আল্লাহর বান্দা ওমর ইবন খত্তাব ঈলিয়ার অধিবাসীদেরকে নিরাপত্তা বিদান করেছে। এ পরিপত্রের মাধ্যমে তাদেরকে তাদের দীন ধর্ম, জান মাল, উপাসনালয়, তাদের ক্রুস, তাদের গোটা মিল্লাত রক্ষার জন্য নিরাপত্তা বিদান করা হলো। তাদের উপসনালয় বন্ধ করা হবে না, তাদের গির্জা ভেঙ্গে ফেলা হবে না, তার কোনো ক্ষতিও করা হবে না। তার আশে পাশের বা তার ক্রুসের ক্ষতিও করা হবে না। তার কোনো ধন সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে না। তাদেরকে দীন ধর্ম ত্যাগ করার জন্য বাধ্য করা হবে না। তাদের কাউকে কষ্টও দেয়া হবে না। তাদের সাথে ঈলিয়ায় কোনো ইহুদীও বসবাস করবে না।… [ তারীখে তাবারী, মিসর: দারুল মআরিফ,খ-৩, পৃ-৬০৩]

খালেদ ইবন ওয়ালিদ যখন সেনাধিনায়ক ছিলেন, তখন আনাতের অধিবাসীদের নিরাপত্ত দিতে গিয়ে চুক্তি করা হয়েছিল। সেই চুক্তিপত্রে লেখা হয়েছিল ‘তারা নামাযের সময় ব্যতীত রাত দিনের যে কোনো সময় তাদের গির্জার ঘন্টা বাজাতে পারবে। তাদের বড়দিনে তারা ক্রুস নিয়ে মিছিলও করতে পারবে।’ [আবু ইউসুফ, আল খরাজ, পৃ-১৪৬]

ইসলাম অমুসলিমদের কাছে কেবল এটাই দাবি করে যে, তারা মুসলমানদের দ্বীন ধর্ম তাদের ধর্মীয় নিদর্শনসমূহকে শ্রদ্ধা করবে। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় তারা তাদের ধর্মীয় নিদর্শন ও তাদের ক্রুস প্রকাশ করবে না। যে এলাকায় আগে কোনো গির্জা বা উপাসানালয় ছিল না সেখানে কোনো নতুন উপাসানালয় নির্মাণ করবে না। কারণ এটা করা মানে মুসলিম মানসিকতার সাথে চ্যালেঞ্জ করা। যার করাণে মুসলমান ও অমুসলিমদের মাঝে ফিতনা ফ্যাসাদ সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকে।

মুসলিম ফকীহদের মাঝে অনেকেই সরকারের অনুমতি নিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়, আর যেসব এলাকা মুসলমানরা অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করে দেশ দখল করে নিয়েছে সেখানে তারা তাদের উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারবে বলেও অভিমত দিয়েছেন। সরকার যদি এতে কোনে কল্যাণ দেখে তবে অনুমতি দিতে পারে। কারণ ইসলাম তাদেরকে তাদের দ্বীন ধর্ম নিয়ে বেচে থাকার অধিকার দেয়। এটি যাইদিয়া মাযহাবের ফকীহ ও মালেকী মাযহাবের ইবন কাসেমের অভিমত।’ [দেখুন, আহকামুয যিম্মিঈন ওয়াল মুস্তামেনীন, পৃ-৯৬-৯৯]

চলবে…

লেখক: অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Comments

comments