‘ছাত্রলীগ’ ও ‘শিবির শিবির’ মরণখেলা

হাবিবুর রহমান জুয়েল

ঘটনাটি ২০০৮ সালের। আমাকে ফোন করে বলা হলো, ‘তুমি একটু মধুতে আইসো।’

ফোন করা ব্যক্তি নিজেকে পরিচয় দিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক (রিপন-রোটন কমিটি) হিসেবে। পরিচয় জেনে বললাম, ‘জি ভাই, আসব।’

কিন্তু সময়ের অভাবে সেদিন আর মধুর ক্যান্টিনে যেতে পারলাম না। আমি তখন মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাল্গুনি বাস-রুটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি।

এর কিছুদিন আগে আমার রুটের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লালবাস দ্বারা মিলন নামে এক তরুণ মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়। আমি তাকে বাঁচানোর জন্য এদিক-ওদিক ছুটছি। লোকটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমি ফাল্গুনি বাস-রুটের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় চষে বেড়াচ্ছি টাকা তোলার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস যেসব রুটে চলে, তার প্রত্যেকটি রুটে চিঠি দিলাম সহযোগিতার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়ে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্ধ নিলাম। ভ্যালেন্টাইন্স ডে’র দিন ক্যাম্পাসে ফুল বিক্রি করলাম। এত এত ব্যস্তার ভেতর মধুর ক্যান্টিনে যাওয়া হয়নি আর।

একদিন বাসায় ফেরার পর আবার সেই ফোন। ধমকের সুরে বললেন, ‘বাইন… (গালি) তোরে না দেখা করতে বলছিলাম।’

আমি তোতলাতে তোতলাতে বলি, ‘জি ভাই, করুম…।’

এরপর আবার ফোন, ‘ওই শুনলাম তুই চাঁদাবাজি করছ? রুটের প্রেসিডেন্ট হইছস মাল-পানি তো ভালোই কামাস। পুরা ক্যাম্পাসে ধান্দা করতাছস ব্যাটা।’

ঢোক গিলে বললাম, ‘না ভাই, নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে রুটের টুকটাক খরচ চালাতে হয়।’

তিনি বললেন, ‘বাইন… তোরে পাইয়া লই।’

ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে আসে। একজন কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতার হুমকিতে ভয় পাবারই কথা।

এদিকে চিকিৎসাধীন মিলনকে বাঁচাতে হবে। লোকটি অনেক অসহায়। তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী, তার পরিবার আমার হাত ধরে কান্নাকাটি করছে। আমার মাথা এলোমেলো হয়ে আছে। তাদের কথা দিয়েছি, যেভাবেই হোক তাকে বাঁচাবই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুমতি নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) একটা ফিল্ম শো’রও আয়োজন করলাম।

টিএসসিতে ছবি চলছে। রুটের এক ছোট ভাই ও বোনকে নিয়ে আমি বিজনেস ফ্যাকাল্টির গেটে বসে টিকেট বিক্রি করছি। এমন সময় সেই কেন্দ্রীয় নেতা এসে হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘ওই জুয়েল ক্যাডা রে?’

বললাম, ‘জি, আমি’।

সঙ্গে সঙ্গেই শরীরের সব শক্তি দিয়ে ঠাস করে আমার গালে চড় মেরে বসলেন তিনি। আমি হাতের ইশারায় ছোট দুই ভাইবোনকে বললাম, ‘তোমরা চলে যাও।’

ওরা চলে গেল। ‘বড় ভাই’ আমার আরেক গালে চড় মারলেন। আমি দুগালে হাত দিয়ে বসে পড়লাম। বহুদিনের ক্লান্ত শরীর, কারণ মিলনকে বাঁচানোর জন্য দৌড়াদৌড়ি। উঠে দাঁড়াতেই সজোরে লাথি মারলেন। আমি ‘ভাই, ভাই…’ করতে লাগলাম। গেটের দারোয়ান আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘এইলায় এহানকার বড় ভাই। মিয়া মানুষ চিনো না।’

নেশাগ্রস্ত ‘বড় ভাই’ টলতে টলতে বিজনেস ফ্যাকাল্টির এক কোণায় পরে থাকা ভাঙা-চোরা কাঠের স্তুপ থেকে একটা ভাঙা চেয়ারের হাতল নিলেন আমাকে মারার জন্য। আমি তার পা জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, ‘ভাই আমাকে মাফ করে দেন।’

আমার দু’চোখ জলে ভরে এলো। চোখ ফেটে কান্না আসছিল। আশপাশে সবাই তাকিয়ে দেখছে। কিন্তু কেউই এগিয়ে আসছে না। একটা ছেলে পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে, আর সবাই সার্কাস দেখার মতো ‘হা’ করে দেখছে।

‘বড় ভাই’ রাগ সামলাতে পারলেন না। আমাকে আরেকটা লাথি মারলেন। এবার আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। এরপর চিৎকার করে বললেন, ‘বাইন… মধুতে দেহা করস নাই, একা খাইতে চাস? বাইন… শিবির করস? শিবির করস?’

চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘এই শালায় শিবির করে, মাদার… শিবির। খান… পোলারে মাইরা ফালামু আইজ।’ মাদকাসক্ত নেতার মুখে তখন গালির খই ফুটছে।

‘শিবির শিবির’ শুনে আমার মাথা ঘুরতে লাগল। ছাত্রলীগের একজন তৃণমূল কর্মী আমি। আমাকে বলছে ‘শিবির’!

ভেবেছিলাম, ওখানেই হয়তো আমার শেষ। আমি তখন ইত্তেফাকের ফিচার প্রতিবেদক। ভাবলাম, এই পরিচয় কাজে লাগতে পারে বাঁচার জন্য। বললাম, ‘ভাই আমি শিবির না, ছাত্রলীগ করি। আর ইত্তেফাকে কাজ করি।’

আগের দিন ইত্তেফাকে ক্যাম্পাসের মাদক বাণিজ্য নিয়ে বিশাল প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। ইত্তেফাকে কাজ করি শুনে আরো উত্তেজিত হয়ে গেলেন ‘বড় ভাই’। মাথার চুলের মুঠি ধরে পিঠের ওপর মারতে লাগলেন অনবরত।

‘হালায় শিবির করে, হালায় শিবির করে’ বলে চিৎকার করতে লাগলেন। সূর্যসেন হল থেকে কয়েকজন ছেলে ছুটে আসছিল মারমুখো হয়ে। গেটের দারোয়ান বললেন, ‘ভাই ছাইড়া দ্যান, পোলাডা মইরা যাইব।’ আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘ওই মিয়া দৌড়াও না ক্যান। বাঁচনের আশা থাকলে দৌড় দাও।’

আমি কোনোরকম উঠেই ছুটলাম। সব ফেলে জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে লাগলাম। এক দৌড়ে শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরিতে ঢুকে পেছনের দিকে গিয়ে বসে অঝোরে কাঁদতে লাগলাম। আমার সামনে সব টলতে লাগল।

পরের দিন ইত্তেফাকের শেষ পাতায় ছাত্রলীগের সেই কেন্দ্রীয় নেতা ও ক্যাম্পাসের মাদক-সম্রাট ক্যারা-মামুনের হাতে আমার মার খাওয়ার সংবাদটি বড় শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।

কীভাবে নিরীহ কাউকে শিবিরের ব্লেইম দেওয়া হয়, সেই বীভৎস রূপ আমি দেখিছি।

দোহাই লাগে আপনাদের কাছে। কোনো ছেলেকে শিবির ও কোনো মেয়েকে ছাত্রী সংস্থার ব্লেইম দেওয়ার আগে ভাবুন। ভাবুন এবং ভাবুন। আপনাদের এই খেলা আপনাদের দিনকে দিন আস্তাকুঁড়েই ছুড়ে ফেলবে। আর কিছু নয়।

Comments

comments